২১শে জুলাই, ১৯৮৪। ইডেনে দুই প্রধানের শেষ সাক্ষাৎকার
দি নিউজ লায়নঃ “উত্তেজনাহীন, একঘেয়ে প্রথমার্ধের ঝুলে যাওয়া খেলা দেখে যখন একটি নিশ্চিত ড্রয়ের চিন্তা জাগছিল, ঠিক তখনই ম্যাচের সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটি ঘটে গেল। দ্বিতীয়ার্ধের খেলা তখন সাত মিনিট। ইস্টবেঙ্গল পেনাল্টি বক্সের বাইরে থেকে প্রশান্তর বাঁ পায়ের ‘ডায়াগোনাল স্পিন’ মেশানো আপাত-নিরীহ ফ্রিকিকটি দুই স্টপারের মধ্যে ঝুলে রইলো , অল্পসময়। সেই সামান্য ফাঁকে কৃষ্ণগোপাল ছুটে এসে মাথা ছুঁইয়ে বলের গায়ে বাবু মানির ঠিকানা লিখে দিলেন। ডিপ-ডিফেন্সের দুটি সব চেয়ে মজবুদ মিনার মনোরঞ্জন- তরুণকে পায়ের ছোট টাচে টলিয়ে দিয়ে কৃতজ্ঞ বাবু মানি ঠাণ্ডা মাথায় বল ঠেলে দিলেন জালে। ‘গো ও ল’ শব্দে গর্জে উঠল ইডেন।
মাত্র কয়েকটা মুহূর্তের মধ্যে ঘটে গেল সব কিছু। বিস্মিত ইস্টবেঙ্গল সমর্থকরা শুধু দেখলেন, ডিফেন্ডাররা নির্বাক, হতভম্ব। অসহায়ভাবে মাটিতে পড়ে আছেন শেষ প্রহরী ভাস্কর। এবং উনিশ নম্বর জার্সি পড়া একটি কানাড়ি যুবক তাঁদের সব সম্মান স্বপ্ন লুঠ করে, দুহাত আকাশে ছড়িয়ে মিশে গেলো মোহনবাগানিদের আলিঙ্গণে, উল্লাসে”। আনন্দমেলার পাতায় বাবু মানির গোলের বর্ণনা। ২১শে জুলাই। ইডেন উদ্যানে শেষ বড় ম্যাচ। পরের দিন কাগজে হেডিং ‘মানিই ছিলেন মধ্যমণি’। বাবু মানি।
বাঙ্গালোরের অশোকনগর। সেখানেই ছোট একটি ঘরে থাকতেন এম বাবু। দুই ছেলের মধ্যে বড় ছেলে রাজ্জু। আর ছোট ছেলে মানি। দক্ষিণ ভারতের প্রথা মত নিজের নামের সাথে বাবার নাম যোগ করে ছোটছেলে পরিচিত হল বাবু মানি নামে। বাবা এম বাবু ছোটখাটো কাজ করতেন সিনেমা হলে। তবে সময় পেলেই ছেলের খেলা দেখতে চলে যেতেন মাঠে। মা সুশীলা দেবীও ছোট ছেলের দিকে নজর রাখতেন। তাঁদের আশা ছিল এই ছেলে একদিন ফুটবল খেলেই তাঁদের মুখ উজ্জ্বল করবে।
খেলা শুরু করেছিলেন স্থানীয় ইন্ডিপেন্ডেন্স ক্লাবে, ১৯৭৭ সালে। পরের বছর বাঙ্গালোরের তৃতীয় ডিভিশনের ক্লাব রিনাইকোতে চলে এলেন। ১৯৮০-তে ডাক এল বাঙ্গালোরের বিখ্যাত আই টি আই দলের জুনিয়র টিম থেকে। সেখানকার প্রথম ডিভিশনে খেলত এই দলটি। মানির জীবনের মোড় ঘুরল এবার। সাব জুনিয়র স্তরে মানির খেলা দেখে খুশি হলেন এক অতীতের এক বিখ্যাত খেলোয়াড় রমন। তাঁর সুপারিশে মানির জায়গা হল সন্তোষ ট্রফির দলে। কর্ণাটকের হয়ে ত্রিচূরে ন্যাশানালে দারুন খেললেন মানি। পাঞ্জাব আর বিহারের বিপক্ষে গোলও দিলেন। চোখে পড়লেন ফুটবল বিশেষজ্ঞদের ।
কোচ মইনুদ্দিন ও বাবার সাথে মানি একদিন পাড়ি দিলেন কলকাতায়। আন্তঃরাজ্য ছাড়পত্র জমা দিয়ে সই করলেন মহামেডান স্পোর্টিংয়ে। ১৯৮২ সাল সেটা। মানির বয়স তখন আঠেরো। বিরাশিতে মহামেডানে মজিদ, জামশিদ, সাব্বির আলি, সোমনাথ ব্যানার্জিরা খেলছেন ফরোয়ার্ডে। স্বাভাবিক কারনেই বেশি সুযোগ পেলেন না মানি। তবু কালিকটে ফেড কাপে আর কলকাতা লিগে যে ম্যাচগুলোয় খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন ভালোই খেলেছিলেন। মহামেডান কোচ নঈমুদ্দিন তখন বয়েসে ছোট মানিকে পুরো ম্যাচে খেলাতে সাহস করতেন না। অল্প সময় রাখতেন মাঠে।
পরের বছর মহামেডান প্রথমে যোগাযোগ করেনি। পরে ফেডারেশন কাপের সময় যোগাযোগ করে। ফেডারেশন কাপে সেরকম সুযোগ না পাওয়া গেলেও কলকাতা লিগে মজিদ, জামশিদ, উলগানাথনদের পাশে দারুন খেললেন মানি। পরের বছর অমলরাজ, ফরিদের সাথে সাথে মানিকেও টার্গেট করল মোহনবাগান। বাঙ্গালোরে গিয়ে তাঁর বাবা-মার সাথে কথা বলে এলেন কয়েকজন কর্তা। এই কাজে সাহায্য করলেন উলগানাথন। দলবদলের সময় টনক নড়ল মহামেডান কর্তাদের। তাঁরা যখন মানি, অমলরাজদের খুঁজছে সেই সময় হরিশ মুখার্জি রোডে মোহনবাগানের রিক্রুটার গজু বসুর বাড়িতে স্বেচ্ছাবন্দী খেলোয়াড়রা।
শোনা যায় মহামেডান থেকে আসা খেলোয়াড়দের কেউ যাতে ছিনিয়ে নিয়ে যেতে না পারে সেই জন্য মন্ত্রী যতীন চক্রবর্তী সকালে প্র্যাকটিসের সময় মাঠে পাহারা দিতেন। ১৯৮৪ নিঃসন্দেহে মানির জীবনের অন্যতম একটি টার্নিং পয়েন্ট। নেহেরু কাপে ভারতীয় দলে নির্বাচিত হলেন। এশিয়া কাপে তাঁর অনবদ্য খেলা আজও অনেকের স্মৃতিতে অমলিন। কলকাতা লিগের প্রথম খেলাতেই হ্যাট্রিক করলেন জর্জের বিপক্ষে। আর ইডেনে সেই শেষ ডার্বি ম্যাচ। খেলার শেষে সমর্থকদের কাঁধে চড়ে ইডেন থেকে মোহনবাগান তাঁবুতে ফেরা।

Post a Comment