এক ক্লাব প্রেমী কর্মকর্তার জীবনী - The News Lion

এক ক্লাব প্রেমী কর্মকর্তার জীবনী

 


দি নিউজ লায়নঃ    কলকাতার ঐতিহ্যময় দে’জ গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজের কর্ণধার না, তিনি ভালবাসতেন নিজেকে কলকাতার আর এক ঐতিহ্যময় প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হিসেব ভাবতে।তিনি ধীরেন দে, মোহনবাগানের ধীরেন দে।১৯২৯ থেকে ১৯৯০, প্রায় সাত দশক, মোহনবাগান ক্লাবের সাথে প্রথমে খেলোয়াড়, পরে কর্মকর্তা হিসেবে সম্পর্ক ছিল ধীরেন দের।


১৯২৭ সালে ধীরেন দে থাকতেন জোড়া বাগান অঞ্চলে, ক্রিকেট খেলতেন অরোরা ক্লাবে l মোহনবাগানের সাথে একটি ফ্রেন্ডলি ম্যাচ ছিলো অরোরা ক্লাবের l তখন তার বয়স ছিলো পনেরো কি ষোল l সেই ম্যাচে তাঁর খেলা দেখে এস কে মিত্র তাঁকে মোহনবাগানে খেলার প্রস্তাব দেন lসে বছরের পরের বছর ১৯২৯ সালে তখনকার মোহনবাগান সচিব জে এন বসুর ডাকে শেষ পর্যন্ত ক্রিকেটার হিসেবে ধীরেন দে মোহনবাগান ক্লাবে যোগ দেন l ভালো গোলকিপিংও করতেন ধীরেন দে, ওই সময় ক্লাবের হয়ে বেশ কিছু ফুটবল ম্যাচও খেলেছিলেন তিনি l যদিও বেশী পরিচিত ছিলেন  ক্রিকেটার হিসেবেই l


১৯৩৫ সালে কয়েক বছর ক্রিকেট খেলার শেষে ক্লাব কর্তারা ধীরেন দে-কে ক্রিকেট বিভাগের ক্লাব প্রশাসনে নিয়ে আসেন। তখন তাকে দে’জ মেডিকেলে যেতে হত ব্যবসা সামলাতে। তাঁর দাদাই মোহনবাগানের প্রতি তাঁর উৎসাহ দেখে ব্যবসা থেকে তাঁকে একটু ছাড় দিলেন আর তিনিও মেতে গেলেন ক্রিকেট নিয়ে l এভাবে বেশ কয়েকবছর কাটার পরে ক্লাবের নির্বাচন এল, হাওয়া তখন খুব গরম, মোহনবাগানের নির্বাচন থাকলে যা হয়l ডাঃ বিধান চন্দ্র রায় তখন মুখ্যমন্ত্রী l ধীরেন দেরা সবাই গেলেন তাঁর কাছে। ডাঃ বিধান চন্দ্র রায় বললেন “এমন একজনকে সচিব করবেন , যিনি মোহনবাগান ক্লাবের জন্য যোগ্য হবেন।“ নির্বাচন হলো l এস এন বসু সচিব আর ধীরেন দে সহ সচিব নির্বাচিত হলেন।এর কয়েক বছর পরেই এস এন বসু মারা গেলেন l কিন্তু ধীরেন দে তখনই সচিব হতে না চাওয়ায় সচিব হলেন বলাই মিত্র।


ক্লাবের যাবতীয় কাজকর্ম অবশ্য ধীরেন দেই করতেনl সে সময় সব ধরনের টিম করা নিয়ে ধীরেন দে মেতে থাকতেন। ক্রিকেটে সি কে নাইডু , মুস্তাক আলি থেকে শুরু করে হেন নামী ক্রিকেটার ছিলেন না, যারা তখন মোহনবাগানে  খেলেননি। তিনি ধ্যানচাঁদকে বললেন মোহনবাগানের জন্য কিছু হকি খেলোয়াড় দিতে। সেই সূত্রে এসেছিলেন অনেক হকি খেলোয়াড়। সদ্যপ্রয়াত হকি লিজেন্ড কেশব দত্ত তখন মোহনবাগানে খেলতেন। ধীরেন দের আমলে হকিতে মোহনবাগানের মতো রেকর্ড কোন ক্লাবের ছিলনা।বেটন কাপ, আগা খান ট্রফি, অল ইন্ডিয়া গোল্ড কাপ সব ট্রফিতেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল মোহনবাগান।


কী ভাবে যোগাযোগ হয়েছিল পেলের সঙ্গে? ১৯৯৩ সালের ১৭ জুলাই ধীরেনবাবু মারা যাওয়ার আগের ২২ বছর একসঙ্গে ছিলেন ধীরাজবাবু৷ ধীরাজবাবুর কথায়, “আমাদের দে’জ মেডিক্যাল সেই সময় নিউ ইয়র্কের স্টার্লিং উইনথ্রপ সংস্থার সঙ্গে কোলাবরেশনে ওষুধ তৈরি করত৷ ধীরেনবাবু ওই সংস্থার মাধ্যমেই যোগাযোগ করেছিলেন কসমসের সঙ্গে৷” পেলেকে কলকাতায় মোহনবাগানের বিরুদ্ধে খেলানো আজও রূপকথা হয়ে ঘোরে কলকাতা ময়দানে। ১৯৭৭। স্টার্লিং উইনথ্রপ সংস্থার মাধ্যমে ধীরেন দে গেলেন পেলের কাছে, কলকাতায় কসমস ক্লাবের হয়ে মোহনবাগানের বিরুদ্ধে খেলার অনুরোধসহ।সে জন্য পেলে বিপুল অর্থ চেয়ে বসলেন। শোনা যায়, এতে হতোদ্যম না হয়ে ধীরেন দের পেলের প্রতি বক্তব্য ছিল, ”তুমি জীবনে কখনো গরীব মানুষ দেখেছ? লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটি এমন লোক আছে ভারতে, যারা গরীবী কয়েকদিনের জন্যে ভুলে যাবে, যদি তোমাকে একবার দেখে। এই কথা শুনে কি জানি পেলে রাজি হয়ে গিয়েছিলেন, শুধু তার স্ত্রীর জন্য একটি হীরের নেকলেস উপহারের শর্তে। ধীরেন দে রাজি হয়ে গেলেন সেই মুহূর্তে। হাঙ্গেরি থেকে দুর্ধর্ষ তাতাবানিয়া টিমকে আনাটাও সম্ভব হয়েছিল ধীরেন দের জন্যই। একটু থেমে ধীরাজবাবু আরো জানিয়েছিলেন, “এটা কী জানেন, ১৯৮৭ সালে কলকাতায় আর্সেনালও খেলতে পারত৷ ধীরেনবাবু আর্সেনালের সঙ্গে সব যোগাযোগ করে ফেলেছিলেন৷ ওরা রাজিও ছিল৷ কিন্তু ভারত সরকারের বৈদেশিক অর্থের আদানপ্রদান নিয়ে তখন কিছু সমস্যা ছিল৷ তাই সেটা হয়ে ওঠেনি৷ ওটাই ওর বড় আক্ষেপ ছিল।”


তখন ইস্টবেঙ্গলের সাথে মাঠ শেয়ার করতে হত মোহনবাগানকে। এই অবস্থা থেকে ক্যালকাটা ক্লাবের কর্নধার ওয়েলসের নাগরিক জন ব্রাইয়ের সাথে কথা বলে তাদের পার্টনার হয়ে ক্যালকাটা মাঠকে নিজেদের মাঠ বানানো, ইস্টবেঙ্গলের সাথে থাকা নিজেদের তাঁবু দশ হাজার টাকা নিয়ে এরিয়ানের জগন্নাথ কোলের কাছে বিক্রি করে সেই টাকায় ক্যলকাটা ক্লাবের গ্যালারি সারিয়ে নেওয়া এবং তারপরে ধীরে ধীরে কংক্রিটের গ্যালারিতে আরো সিট বাড়ানো, এ সবই ছিল ধীরেন দের ব্রেনচাইল্ড।এবার সেনাবাহিনী গ্যালারি ভাঙতে চলে এল, তখন মোহনবাগানপ্রেমী রাজ্যপাল পদ্মজা নাইডুর মাধ্যমে বাবু জগজীবন রামকে ধরে সরাসরি ইন্দিরা গান্ধীর সাথে কথা বলে গ্যালারি ভাঙ্গা আটকালেন ধীরেন দে, আদায় করলেন কংক্রিট গ্যালারির অনুমতি। ধীরেন দে বলতেন “মোহনবাগান নামটাই সব, অনেক কাজ হালকা করে দেয়।” তারপর আজকের এই সুদৃশ্য লন, তখনকার ডি সি হেড কোয়াটার্সকে বলে ক্লাবের মাঠের উল্টো দিকে অনেকটা সরে গঙ্গার দিকে বাড়িয়ে নিয়েছিলেন l


শোনা যায়, অমিতাভ বচ্চন নাকি  কলকাতায় শুটিং করার ফাঁকে মোহনবাগানের খেলা দেখতে আসতে চেয়েছিলেন একবার মোহনবাগান মাঠে ( তার মোহনবাগানপ্রেমের কথা “কৌন বনেগা ক্রোড়পতি”র সেটে নিজেই জানিয়েছিলেন অমিতাভজী দু’বছর আগে )। যাই হোক, মাঠের শৃঙ্খলা নষ্ট হবে বলে সচিব ধীরেন দে সেবার অনুমতি দেননি। তাই অমিতাভজীর সে ইচ্ছে আর পূরণ হয়নি সেবার।এখনকার দিন হলে অমিতাভজীকে মাঠে এনে “ফুটেজ” খাওয়ার টুর্ণামেন্ট শুরু হয়ে যেত।


দিল্লি ক্লথ মিলস বা ডিসিএম। মোহনবাগান যে বছর প্রতিষ্ঠিত হয়, সেই ১৮৮৯ সালে এই কোম্পানির জন্ম হয়। চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে এই কোম্পানির উদ্যোগে শুরু হয় ডিসিএম ফুটবল প্রতিযোগিতা। ইস্টবেঙ্গল আর মহামেডান প্রথম থেকেই এতে অংশ নিলেও মোহনবাগান বহুদিন অংশ নেয়নি। ভারতীয় দলগুলি সত্তর দশক অবধি চ্যাম্পিয়ন হলেও এরপর বিদেশি কিছু দল খেলতে শুরু করলে তাঁদের সাফল্যে ভাটা পড়ে। মোহনবাগান কেন অংশ নিত না? প্রাইভেট টুর্নামেন্টে খেলতে মোহনবাগান অফিসিয়ালরা (পড়ুন, ধীরেন দে) রাজী ছিলেন না। বিদেশী না খেলানোর মতো এটাও মোহনবাগানের ঐতিহ্যের সাথে মিশে গিয়েছিল তখন। ডিসিএম টুর্নামেন্টকে ধীরেন দে বলতেন তোয়ালেওয়ালার টুর্নামেন্ট। ১৯৯৩ সালে তাঁর মৃত্যুর চার বছর পরে  এই ডিসিএম টুর্নামেন্টে খেলে প্রথম বিজয়ী হয়েছিল মোহনবাগান।ততদিনে বিদেশী ফুটবলার খেলানোও শুরু করে দিয়েছিল মোহনবাগান।


মোহনবাগানের সবচেয়ে সফল সচিব ধীরেন দের কিছু অদ্ভুত সংস্কার ছিল। ম্যাচের দিন রেডিওর ধারাবিবরণীও না শুনে, গ্যালারিতে না বসে তিনি বসে থাকতেন দূরে রাখা নিজের গাড়িতে বা গঙ্গাপারের কোনও নৌকোয়।তখনো মোবাইল আসেনি কলকাতায়।নিজের ড্রাইভারকে বারবার মাঠে পাঠাতেন, খেলার ফল জানতে। মাঠের শব্দব্রহ্ম শুনেও অনেক সময় বুঝে নিতেন যে গোল হয়েছে কিনা। ময়দানি মিথ, ধীরেন দে নাকি ছিলেন উন্নাসিক৷ তাঁকে সব সময়ই দেখা যেত নাকে রুমাল চাপা দিয়ে৷ আসল সত্যিটা হল, ধীরেনবাবুর ছিল মারাত্মক ধুলোয় অ্যালার্জি। তাই তাঁকে দেখা যেত রুমাল নাকে দিয়ে৷ ধীরেন দে মানেই ছিল তাঁর আশপাশের সব কিছু গোছানো৷ পরিষ্কার৷


ধীরেন দের সময়ে বারপুজোর দিনে ফুটবলারদের লাইন পড়ে যেত ক্লাব তাঁবুতে। বারপুজোর দিন মোহনবাগানের স্বনামধন্য কর্মকর্তা ধীরেন দে একদম সকাল সকাল দুধ সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি পড়ে চলে আসতেন ক্লাবে। পয়লা বৈশাখের দিন ধীরেনদা নিজে হাতে পাঁঠার মাংস রান্না করে সকলকে খাওয়াতেন। সেই স্বাদ এখনও মুখে লেগে আছে সেই সময়ের লোকজনের। এ ছাড়াও তিনি সঙ্গে নিয়ে আসতেন এক বটুয়া রুপোর কয়েন। যা নেওয়ার জন্য ফুটবলারদের মধ্যে হুড়োহুড়ি লেগে যেত। খুব রাশভারী, রুচিশীল ও খুঁতখুঁতে মানুষ ছিলেন ধীরেন দে। রুপোর কয়েন পাওয়ার জন্য নূন্যতম যোগ্যতামান বেঁধে দিতেন তিনি। ভাল ফুটবল খেলা নয়, কয়েন পাওয়ার জন্য ফুটবলারদের সুদর্শন হওয়াটা ছিল বেশি জরুরি। তবে এমনটা তিনি করতেন মজা করে। পরে অবশ্য সবাইকেই কয়েন দিতেন।এই একদিন তিনিও রাশভারী ইমেজটা মাঠের বাইরে রেখে আসতেন।


শুধুমাত্র সততা দিয়েই ক্লাবকে ভালোবেসে ক্লাবের কাজে সম্পূর্ণ নিবেদিত ছিলেন ব্যাচেলর ধীরেন দে। ক্লাবের জন্য তিনি কাজ করে গেছেন নিঃস্বার্থভাবে, নিঃশব্দে। মোহনবাগান ক্লাব কোনদিন ধীরেন দে র ঋণ শোধ করতে পারবে না। মোহনবাগানের প্রতি তাঁর ভালবাসা ছিল নিখাদ। আজ ২৮তম মৃত্যুবার্ষিকীতে ধীরেন দেকে প্রণাম জানাই।


অন্য এক ধীরেন দেকে চিনেছিলাম ৬ বছর আগে, একটি লেখা পড়ে।সবশেষে ২৬ ডিসেম্বর ২০১৫র এবিপি পত্রিকার পাতায় প্রাক্তন সাংবাদিক শ্রদ্ধেয় চিরঞ্জীব-এর সেই লেখাটি হুবহু তুলে ধরে করে এই লেখাটি শেষ করছি।


"লেক প্লেসের বাড়িতে বসে জ্যোতিষ গুহ টেলিফোন কলটা পেলেন। রিসিভারের অপর প্রান্তে ধীরেন দে, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মোহনবাগানের কর্মকর্তা, ‘‘আপনি নাকি ময়দানে আসা ছেড়ে দিয়েছেন? এটা চলবে না, আমি চলতে দেব না। আপনার মতো মানুষকে ছাড়া ময়দানে খেলাধুলো হবে কী করে? আজ, এই মুহূর্ত থেকে আপনি মোহনবাগানের মেম্বার। অনারারি লাইফ মেম্বার।’’ টেলিফোন রেখে দেওয়ার পরেও জ্যোতিষদা কিছুটা আপ্লুত, কিছুটা বিহ্বল।কী করবেন, বুঝে উঠতে পারছেন না! কারণ, ইস্টবেঙ্গল ক্লাব আর তিনি যে সমার্থক!


১৯৭০-এর কথা। ক্লাবের নির্বাচনে সে বার জ্যোতিষদা হেরে যান। হারের নেপথ্যে ছিলেন তাঁর একদা অতি বিশ্বাসভাজনদেরই কেউ কেউ। ক্লাবের ক্ষমতায় আসীন হলেন নৃপেন দাস। ওই গোষ্ঠী এসে জে সি গুহকে এক রকম ব্রাত্যই করে দিল। জ্যোতিষদা ভাবতেই পারছিলেন না, যে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবকে তিনি সব সময়ে বুক দিয়ে আগলেছেন, সাফল্যের শিখরে তুলে নিয়ে গিয়েছেন, সেই ক্লাবেই তিনি অপাংক্তেয়! এটা জ্যোতিষদার মতো মানুষের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। তাই, একটা সময়ে ময়দানে যাওয়াই বন্ধ করে দিলেন তিনি।


খবরটা মোহনবাগানের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা ধীরেন দে-র কানে গেল। আর তার পরেই ওই ফোন। জ্যোতিষ গুহের সঙ্গে তাঁর এক সময়ের বিশ্বস্তদের অধিকাংশ বিশ্বাসঘাতকতা করলেও অল্প কয়েক জন কিন্তু তাঁকে ছেড়ে যাননি। ধীরেন দে-র ফোনটা যখন এল, তাঁরা তখন জ্যোতিষদার বাড়িতে। ফোন রেখে কিছুটা ধাতস্থ হওয়ার পর জ্যোতিষ গুহ তাঁর ওই স্নেহভাজনদের বললেন, ‘‘ধীরেন ফোন করেছিল। আজ থেকে আমি নাকি মোহনবাগানের মেম্বার। একটা সময়ে ইস্টবেঙ্গলের গোলকিপার ছিলাম। পরে সেক্রেটারি হয়েছি। তোমরাই দেখেছ, কী ভাবে সন্তানের মতো লালন-পালন করেছি ক্লাবটাকে। আর আজ সেই ক্লাবেরই আমি কেউ নই।’’


তার পর বললেন, ‘‘তোমরা যারা ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে আর যাবে না বলে ঠিক করেছ, তারাও আমার সঙ্গে কাল মোহনবাগান লনে বিকেলের আড্ডায় চলো।’’ খবরটা পেয়ে মোহনবাগান ক্লাবের লনে পরদিন অপেক্ষা করছিলাম। বিকেল হতেই দেখলাম, ধবধবে সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি শোভিত, ঋজু, দীর্ঘদেহী জ্যোতিষদা সবুজ-মেরুন তাঁবুর গেট দিয়ে ঢুকছেন।


লনে তখন বিভিন্ন গোলটেবিলে প্রবীণ ও মাঝবয়সিরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আড্ডায়। জ্যোতিষদাকে দেখেই উমাপতি কুমার বললেন, ‘‘আরে জ্যোতিষ, এ দিকে এসো।’’ অন্যেরাও ডাকছেন। ধীরেন দে ওই ফোনালাপের কথা আগেই বলে রেখেছিলেন সবাইকে। জ্যোতিষদার ক্লাবে ঢোকার খবর পেয়েই টেন্টের ভিতর থেকে স্যুটেড-বুটেড ধীরেনদা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন লনে। তার পর জ্যোতিষদাকে জড়িয়ে ধরলেন। শৈলেন মান্না জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘একটু চা খাবেন তো?’’ পরে এক দিন কথায় কথায় এই প্রসঙ্গে জ্যোতিষদা বলেছিলেন, ‘‘ধীরেন দে-র ওই আহ্বান আমার কাছে অভাবনীয় ছিল। আমাকে ওই ভাবে মর্যাদা দিল! কোনও দিন ভুলতে পারব না।’’


জ্যোতিষ গুহ ইস্টবেঙ্গলের ও ধীরেন দে মোহনবাগানের সচিব হয়েছিলেন। কিন্তু তার আগে সহ-সচিব থাকাকালীনই দু’জনে হয়ে উঠেছিলেন নিজের নিজের ক্লাবের সর্বময় কর্তা। জ্যোতিষ গুহকে যখন মোহনবাগান ক্লাবের আজীবন সদস্য করে দেওয়ার কথা বলে আহ্বান জানানো হল, ধীরেন দে তখন মোহনবাগানের সহ-সচিব। বয়সে জ্যোতিষ গুহর চেয়ে ধীরেন দে অনেকটা ছোট তবে জ্যোতিষ গুহ যেমন ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের সঙ্গে ওতপ্রোত হয়ে যাওয়া প্রথম কর্মকর্তা, মোহনবাগানের ক্ষেত্রে ধীরেন দে-ও তাই।


দু’জনের চরিত্রে, কাজের ধরনে প্রচুর পার্থক্য ছিল। জ্যোতিষ গুহের ইউএসপি যদি ব্যক্তিত্ব ও স্থৈর্য হয়, তা হলে ধীরেন দে ছিলেন বর্ণময়।খেলোয়াড়দের সম্ভ্রম ও সম্মান পাওয়ার পাশাপাশি জ্যোতিষদা ছিলেন তাদের কাছের মানুষ। অন্য দিকে, ধীরেনদা ছিলেন একটু দূরের, যেন ধরাছোঁয়ায় ভয় হয়। জ্যোতিষদার ট্রেডমার্ক ছিল ধুতি-পাঞ্জাবি, ধীরেনদার স্যুট-টাই। তবে প্রথম জীবনে জ্যোতিষদাও বহু বার সাহেবি পোশাক পরেছেন।


তবে দে’জ মেডিক্যালের ডিরেক্টর ধীরেনদা অনেক সময়েই তাঁর কোম্পানির ওষুধ খেলোয়াড়দের বিনামূল্যে দিতেন। আসলে স্যুট-বুট-টাই, মাঝেমধ্যে গগলস পরা ধীরেন দে ছিলেন আনখশির বাঙালি সাহেব। ধীরেনদার এই পোশাক-পরিচ্ছদই অন্য অনেকের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব তৈরি করেছিল।"



কোন মন্তব্য নেই

Thankyou To Comment us

Blogger দ্বারা পরিচালিত.