হুল দিবস মানে আনন্দ নয়, ৩০ হাজার শহীদদের আত্মবলিদান,
দি নিউজ লায়ন; হুল বিদ্রোহ হল নিপীড়িত মুক্তিকামী মানুষের স্থায়ী প্রেরণার উৎস। ১৮৫৫-১৮৫৬ সালের হুল বিদ্রোহে ৩০,০০০ মুক্তিকামী সংগ্রামী শহীদ হয়েছিলেন। সেই শোষিত শ্রেণীর রক্ত জল করা পরিশ্রমের ফসলে উদরপূর্তি করে হয় মোচ্ছব সরকারি ব্যবস্থাপনায়। উপেক্ষিত থেকে যায় বিপ্লবীদের আত্ম বলিদান। আদিবাসী সমাজ সহ সাধারণ মানুষ জানতেও পারে না ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম সশস্ত্র গণসংগ্রামের বীরগাথা। যে দিনটিতে সারা ভারতবর্ষে কোটি কোটি মোমবাত জ্বলে ওঠার কথা,তার পরিবর্তে চলে ধামসা মাদলের তালে উদ্দাম নৃত্য সহ খানাপিনা, উপেক্ষিত রয়ে যায় প্রকৃত ইতিহাস।
সাঁওতালি ভাষায় হুল শব্দের অর্থ হলো-বিদ্রোহ বা বিপ্লব। বিপ্লব হল প্লাবনের ধারা, যা একাধিক ঘটনার সমাবেশে সংগঠিত হয়। সাঁওতাল হুল বিদ্রোহ হল পরাধীন ভারতবর্ষে ইংরেজ সরকার ও তাদের মদতপুষ্ট জমিদারদের বর্বোরোচিত অত্যাচারের বিরুদ্ধে বাঁধভাঙ্গা স্বতঃস্ফূর্ত সশস্ত্র সংগ্রাম। যে অসম সংগ্রামের অনিবার্য পরিণতি ছিল পরাজয়, কিন্তু কোনমতেই আত্মসমর্পণ নয়।
সাঁওতাল বিদ্রোহ ছিল কার্যত তুষের আগুন। যা ধিকি ধিকি জ্বলতে জ্বলতে একসময় দাবানলের রূপ নিয়েছিল। ১৭৮০ সালে তিলকা মুরমুর নেতৃত্বে প্রথম বিদ্রোহের সূচনা হয়। ১৭৮৪ সালে ১৭ জানুয়ারি ,ভাগলপুর এবং রাজমহলের কালেক্টর ক্লিভল্যান্ড কে হত্যা করা হয় তিলকা মুর্মুর নেতৃত্বে। পরের বছর তিলকাকে ফাঁসি দেওয়া হয়। এছাড়াও ১৮১১,১৮২০,১৮৩১ সালেও বিক্ষিপ্তভাবে বিদ্রোহ হয়েছিল। কিন্তু ১৮৫৫ সাল থেকে ১৮৫৬ পর্যন্ত সিধু মুর্মু ,কানু এবং তাদের আরও দুই ভাই চাঁদ এবং ভৈরব, দুই বোন ফুল মনি ও ঝানু মূর্মু অর্থাৎ একই পরিবারের ৬ ভাই-বোনের দ্বারা সংগঠিত বিদ্রোহ পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। এই মুর্মু ভাই-বোনেরা তথাকথিত নিন্ম হিন্দু এবং মোমিন সম্প্রদায়ের গরিব মুসলমানদের একত্রিত করে ইংরেজ মহাজন' এবং দাদন ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন সংগঠিত করেছিল তা ছিল পরাধীন ভারতবর্ষের প্রথম বৃহত্তম সশস্ত্র গণসংগ্রাম।
সাঁওতাল সমাজের প্রথা অনুযায়ী কচি শাল গাছের একটি ডাল নিয়ে মোড়ল গ্রামে গ্রামে আমন্ত্রণপত্র পৌঁছে দেন, যা সারজম গিরা নামে পরিচিত।এই আমন্ত্রণপত্র পেয়ে চার শতাধিক গ্রামের ১০,০০০ প্রতিনিধি ভাগলপুর জেলার ভগনাডিহি গ্রামে উপস্থিত হয় ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন রাতে।সিধু একে একে ইংরেজ জমিদার এবং দাদনদারদের বর্বোরোচিত অত্যাচারের বিবরণ তুলে ধরেন প্রতিনিধিদের কাছে। সভাস্থল থেকে আওয়াজ উঠে হুল হুল হুল...।
পরদিন সকালে সিধুর নেতৃত্বে ১০,০০০ বিপ্লবী কলকাতা অভিমুখে গণপদযাত্রা শুরু করে শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার দাবিতে যা ভারতবর্ষের ইতিহাসে প্রথম গণপদযাত্রা।
এই পদযাত্রা সময় অত্যাচারী মহাজন' কেনারাম ভগৎ এবং জঙ্গিপুরের দারোগা মহেশ লাল দত্ত ৬/৭ জন সাঁওতাল বিদ্রোহীকে বিনা অপরাধে গ্রেপ্তার করে। সিধু কানু কে গ্রেপ্তার করতে গেলে বিপ্লবের আগুন আক্ষরিক অর্থেই জ্বলে ওঠে। বিপ্লবীরা ৭ জুলাই, পাঁচকাটিয়া নামক গ্রামে কেনারাম ভগৎ ও মহেশলাল দত্ত দারোগাসহ ১৯ জনকে নৃশংস ভাবে হত্যা করে। যে বিদ্রোহের আগুন জ্বলেছিল টানা আট মাস ধরে। এই ঘটনার পর বিপ্লবীরা এতটাই মরিয়া হয়ে উঠেছিল যে ২১ জুলাই কাতনা গ্রামে বিপ্লবীদের কাছে ইংরেজ বাহিনী পরাজিত হয়। বীরভূমের প্রধান ব্যবসা কেন্দ্র নাগপুর বাজার ধ্বংস করে দেয় বিপ্লবীরা।পরিস্থিতি আয়ত্বের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে ইংরেজ সরকার ঘোষণাপত্র প্রচার করে বিপ্লবীদের আত্মসমর্পণের জন্য। কিন্তু সিধু কানু তা ঘৃণাভরে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে। এই ঘটনার পর নভেম্বর মাসে ব্রিটিশ সরকার সামরিক আইন জারি করে।
ইংরেজ বাহিনী ১০'০০০ সাঁওতাল বিদ্রোহীকে নৃশংসভাবে খুন করে। কিন্তু বিদ্রোহের আগুন আরো তীব্র ভাবে ছড়িয়ে পড়ে। অবশেষে চাপে পড়ে ব্রিটিশ সরকার১৮৫৬ সালের ৩ জানুয়ারি, সামরিক আইন প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়।কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় বিদ্রোহের শেষ পর্যায়ে ভগবানপুর এর হিলরেঞ্জার্স বাহিনীর হাতে সাঁওতাল বিপ্লবীদের পরাজয় ঘটে।এই আন্দোলনে ৩০,০০০ বিপ্লবী শহীদ হয়েছিলেন। সিধুকে ভগনাডিহি গ্রামে গুলি করে হত্যা করা হয়। বিদ্রোহের মহান নেতা কানুকে ফাঁসি দেয় ১৮৫৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। তাদের বোন ফুলমনিকে বর্বর ইংরেজি বাহিনী গণধর্ষণের পর হত্যা করে রেললাইনের ধারে ফেলে দেয়। ইতিহাসের উপেক্ষিত এই বীরাঙ্গনাকে আজও সাঁওতাল সমাজ বিভিন্ন গানের মাধ্যমে স্মরণে রেখেছে।
দুঃখের বিষয় ব্রিটিশ শাসক গোষ্ঠীভুক্ত সাম্রাজ্যবাদী ঐতিহাসিকগণ ছাড়াও স্বাধীন ভারতের শাসকগোষ্ঠীর সংকীর্ণ মানসিকতার শিকার সাঁওতাল সমাজের এই সশস্ত্র প্রথম গণবিপ্লবের স্বীকৃতি। সেই সময়ের সংবাদপত্র ফ্রেন্ড অফ ইন্ডিয়া, সংবাদ প্রভাকর নগ্নভাবে সাঁওতাল বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে কলম তুলে নিয়েছিল। অতীত এবং স্বাধীন ভারতবর্ষেও রাজ তোষণকারী ঐতিহাসিক এবং লেখকরা শাসন - শোষন ব্যবস্থার প্রয়োজনে আসল ইতিহাস কে চাপা দিয়ে শাসকগোষ্ঠীর ইতিহাস রচনা করে গেছেন, যে বিকৃত ইতিহাস যুগ যুগ ধরে স্বল্প পরিসরে আমরা স্কুলপাঠ্যে পড়ে আসছি।
পরিশেষে বলি এই দিনটিতে শাণিত হোক তীর-ধনুক টাঙ্গি। গর্জে উঠুক প্রতিবাদের ভাষা, অধিকারের দাবি। পালিত হোক বীর শহীদদের স্মরণে শ্রদ্ধাঞ্জলি..., হুল ,হুল,হুল...

Post a Comment