ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি : যেভাবে গড়ে ওঠে আজকের শহীদ মিনার
ঢাকা প্রতিনিধি : ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি ফিরে এলো আবারও। ৫২ এর ভাষা আন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি জ্বলজ্বলে আত্মত্যাগ, গৌরব ও সাহসের স্মারক বহনকারী মাস। ফেব্রুয়ারি মাস মহান ভাষা শহীদদের স্মৃতি রোমন্থনকালে ও তাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের কথা ভাবলেই প্রথমেই কল্পনার চোখে ভেসে ওঠে শহীদ মিনার। আজকের এই শহীদ মিনার যে প্রথম নয়। এর আগেও বেশ কয়েকবার ভাষার জন্য শহীদের স্মরণে তৈরি হয়েছিল শহীদ মিনার। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে করা মিছিলে কাঁদানে গ্যাস ও গুলি চালানো হয়। পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারিতেও প্রতিবাদ মিছিলে গুলি চালায় পাকিস্তানের সামরিক জান্তা সরকার।
এতে শহীদ হন রফিক, সালাম, বরকত, আউয়াল, শফিউরসহ অনেকে।তাদের এই মহান আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধার প্রতীক কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার যা বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজের কাছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে অবস্থিত। বর্তমান আমরা যে শহীদ মিনার দেখছি এর স্থপতি হলেন হামিদুর রহমান। তবে এই শহীদ মিনারটি কিন্তু সর্বপ্রথম তৈরি হয়নি। ক্রমানুযায়ী বিচার করতে গেলে এটির পূর্বে আরো কয়েকবার নির্মিত হয়েছিল শ্রদ্ধার পরিচায়ক এ স্মৃতিস্তম্ভ। যেভাবে প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয় : ২১ ফেব্রুয়ারির ছাত্র-জনতার মিছিলে গুলির ঘটনার পর ২২ ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা শহীদ মিনার বানানোর সিদ্ধান্ত নেয়। কথা মত কাজ শুরু হয় ২৩ ফেব্রুয়ারি।
ঢাকায় কারফিউ থাকা সত্ত্বেও ২৩ ফেব্রুয়ারি বিকেলে কাজ শুরু হয়। শহীদ মিনারটি তৈরি করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা। বদরুল আলম ও সাঈদ হায়দারের নকশায় শুরু করে পুরো রাত কাজ করার পর শহীদ মিনারটি তৈরির কাজ শেষ হয়। শহীদ মিনারটি ছিল ১০ ফুট উঁচু ও ৬ ফুট চওড়া। মিনার তৈরির তদারকিতে ছিলেন জিএস শরফুদ্দিন (ইঞ্জিনিয়ার শরফুদ্দিন নামে তিনি বেশি পরিচিত ছিলেন। আর ডিজাইন করেছিলেন বদরুল আলম তাদের সহযোগীতা করেন দুজন রাজমিস্ত্রী। বর্তমান শহীদ মিনার প্রাঙ্গনে দক্ষিণ-পূর্ব কোণে ছাত্র হোস্টেলের (ব্যারাক) ১২ নং শেডের পূর্ব প্রান্তে হয়েছিল। মেডিকেল কলেজ সংস্কার ও সম্প্রসারণের নিমিত্তে রাখা ইট ও বালু এবং পুরান ঢাকার পিয়ারু সর্দারের গুদাম থেকে আনা সিমেন্ট দিয়ে সাড়ে দশ ফুট উঁচু (৩.২ মিটার) ও ৬ ফুট (১.৮ মিটার) চওড়া শহীদ মিনারটি তৈরি করা হয়।
পিয়ারু সর্দার ছিলেন পুরাতন ঢাকার পঞ্চায়েত সর্দারদের মধ্যে একজন, তার কাছে ছাত্ররা সহায়তা চাইলে তিনি নির্মাণের কাঁচামাল দিয়ে সাহায্য করেন। ভোর আলো ফোটার আগেই শেষ করা হয় নির্মাণ কাজ। এরপর কাপড় দিয়ে ঢেকে দিয়ে সামনে লিখে দেয়া হয় ‘শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ’। ২২ ফেব্রুয়ারি সকালে শহীদ শফিউরের পিতা মাহবুবুর রহমান কর্তৃক অনানুষ্ঠানিকভাবে শহীদ মিনারের উদ্বোধন করা হয়। ইতোমধ্যেই দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ‘শহীদ বীরের স্মৃতিতে’ শিরোনামে শহীদ মিনারের খবর ছাপা হয়। অতঃপর ২৬ ফেব্রুয়ারি শহীদ মিনারের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন দৈনিক আজাদের সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দিন। ওই দিন বিকেলবেলা পুলিশ মেডিকেল কলেজ হোস্টেল এলাকা ঘিরে ফেলে এবং প্রথম শহীদ মিনারটি ভেঙ্গে দেয়। পরে ঢাকা কলেজেও একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা হয়। কিন্তু সেটিও সরকারের নির্দেশে ঘুড়িয়ে দেয়া হয়।
এরপর বিভিন্ন স্থানে একাধিক স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে ওঠে। জানা যায়, রাজশাহী সরকারী কলেজের ছাত্ররা ঢাকায় সর্বপ্রথম শহীদ মিনার নির্মিত হবার আগেই ইট ও কাঁদা দিয়ে প্রথম শহীদ মিনার তৈরি করেছিলেন। সারা রাত জেগে শহীদ মিনারটি নির্মাণ করার পর সকালে পুলিশ গিয়ে তা ভেঙে দেয়া এসময় পুলিশের সঙ্গে ছাত্রদের পিকেটিং করে। রাজশাহীতে নির্মিত শহীদ মিনারে লেখা ছিল “উদয়ের পথে শুনি কার বাণী, ভয় নাই ওরে ভয় নাই। নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান, ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।” ১৯৫২ সালে রাজশাহী কলেজে বাংলাদেশের প্রথম শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণে নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা পালন করেন আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ অপরাধ ট্রাইব্যুানেলর প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু। তার মতে, রাজশাহীর শহীদ মিনার তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়া হয় ২১ ফেব্রুয়ারিতেই এবং এক রাতেই এটি তৈরি করা হয়েছিল। এটিই যে প্রথম শহীদ মিনার সেটা প্রমাণের কোনো চেষ্টা তারা না করলেও সময়ের হিসেবে রাজশাহীর শহীদ মিনারটি ঢাকারটির আগেই তৈরি হয়েছিল বলেই অভিমত ব্যক্ত করেন তিনি।

Post a Comment