মেঘের আড়ালে হারিয়ে গেল মিয়ানমারের গণতন্ত্র! - The News Lion

মেঘের আড়ালে হারিয়ে গেল মিয়ানমারের গণতন্ত্র!

 


আন্তর্জাতিক ডেস্ক : মিয়ানমারে জরুরি অবস্থা জারি করেছে দেশটির সেনাবাহিনী। এক বিবৃতিতে সেনাবাহিনী জানিয়েছে, দেশের ক্ষমতা কমান্ডার-ইন-চিফ মিন অং হ্লেইংয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। অর্থাৎ মিয়ানমারের ক্ষমতা এখন সেনাবাহিনীর দখলে। দেশটির ক্ষমতাসীন দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) প্রধান নেতা অং সান সু চি ও প্রেসিডেন্ট উইন মিন্টসহ দলটির শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার করা হয়েছে।  এর ফলে মিয়ানমারে গণতন্ত্রের সূর্য্য উঁকি দিতে না দিতেই আবার কালো মেঘের আড়ালে হারিয়ে গেছে।   ৬০ বছরের বেশি সময় ধরে মিয়ানমারে ক্ষমতাসীন ছিল জান্তা সরকার। ১৯৮৯ থেকে ২০১০ দীর্ঘ ১৫ বছর অন্ধকার কারাগারে কাটাতে হয় অং সান সু চিকে।


 এরপরও ছিলেন দীর্ঘসময় গৃহবন্দি। ২০১৫ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে ক্ষমতায় এসে বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হন গণতন্ত্রের এই বাতিঘর।  মিয়ানমারের স্বাধীনতার মহানায়ক অং সানের কন্যা অং সান সু চি। তার বয়স যখন দুই, ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে মিয়ানমারের স্বাধীনতা অর্জনের আগ মুহূর্তে নির্মমভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন সু চির বাবা। বয়স বাড়ার সঙ্গে রাজনীতিতে পা রাখেন সু চি। গণতন্ত্রে লড়াই ও নীতিবান অধিকারকর্মীর জন্য গৃহবন্দি থাকা অবস্থায় নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি। তবে সেই শান্তির আলোকবর্তিকার তকমা বেশি দিন টেকেনি।  মিয়ানমারের রোহিঙ্গা গণহত্যায় দেশটির সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ তো নেননি, উল্টো সামরিক বাহিনীর কার্যকলাপে সাফাই গেয়ে বিশ্বজুড়ে সমালোচিত নেত্রী সু চি। 


 রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশ বারবার অবগত করলে এ নিয়ে টালবাহানা করে আসছে সু চি সরকার। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নিতে সু চি কোনো পদক্ষেপই নেননি।  তার এক সময়ের বিদেশি সমর্থক বা বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রগুলো তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে, তিনি ধর্ষণ, হত্যা এবং সম্ভাব্য গণহত্যা রুখতে কোনো পদক্ষেপ নেননি এবং ক্ষমতাধর সামরিক বাহিনীর নিন্দা কিংবা তাদের নৃশংসতার মাত্রাও স্বীকার করেননি। তার দেশের সেনাবাহিনীর বর্বর নির্যাতনের মুখে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন।  এমন বাস্তবতার মধ্যেই ২০২০ সালের নভেম্বরের নির্বাচনে দ্বিতীয়বারের মতো নিরঙ্কুশ বিজয়লাভ করে সু চির দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি- এনএলডি। 


অপরদিকে নির্বাচনে সেনাবাহিনীর সমর্থক রাজনৈতিক দল ইউএসডিপি (ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি) ভরাডুবি হয়।  নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তোলে দেশটির সেনাবাহিনী। গত কয়েক দিন ধরে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে গুঞ্জনের ডালপালা মেলে, সেনাবাহিনী সু চির সঙ্গে দর-কষাকষি করছিল, জেনারেল মিন অং কে প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেনে নিতে। কিন্তু সু চি সেই আপসে যাননি। তারই ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ সেনা অভ্যুত্থান। সেনাবাহিনীর হাতে আটক সু চির ভ্যবিষ্যৎ কী? এ নিয়ে প্রশ্নই থেকে যাচ্ছে।  এদিকে বিশ্ববাসীর চোখ এখন মিয়ানমারের সেনাপ্রধান জেনারেল মিন অং হ্লেইংয়ের ওপর।  তিনি কিভাবে দেশকে সামনে এগিয়ে নেন, বিশ্ববাসী তার বিষয়ে কি সিদ্ধান্ত নেয়- তা এখন আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।  


 ২০০৮ সালে দেশটিতে যে সংবিধান রচিত হয়, তাতে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় স্থায়ীভাবে বড় অবস্থান পাকাপোক্ত করে নেয় সেনাবাহিনী। পার্লামেন্টের মোট আসনের শতকরা ২৫ ভাগ আসন সেনাবাহিনীকে ছেড়ে দিতে হয়। এসব আসনে সেনাবাহিনী যাকে খুশি তাকে নিয়োগ দিতে পারে। এখানেই শেষ নয়, প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র, সীমান্ত বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পদে সরাসরি নিয়োগ দিতে পারেন সেনাপ্রধান। এনএলডির সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগি নিয়ে এমনই চুক্তি করেছিল তারা। অং সান সুচিসহ দলীয় অনেক সদস্য এর আগে সাবেক সামরিক জান্তার বিরোধিতা করার কারণে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।  সেনাপ্রধান মিন অং হ্লেইংয়ের বয়স এখন ৬৪ বছর। তিনি ১৯৭২-১৯৭৪ সাল পর্যন্ত ইয়াঙ্গুন ইউনিভার্সিটিতে আইন নিয়ে পড়াশোনা করেন। তখনও তার মধ্যে রাজনৈতিক সক্রিয়তা তেমন পরিলক্ষিত হয়নি।


 তার একজন সহপাঠী ২০১৬ সালে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছিলেন, মিন অং হ্লেইং খুব কম কথার মানুষ। সাধারণত তিনি লো-প্রোফাইল রক্ষা করে চলেন। যখন সহপাঠীরা বিক্ষোভে যোগ দিলেন তখন মিন অং হ্লেইং প্রধান সামরিক বিশ্ববিদ্যালয় ডিফেন্স সার্ভিসেস একাডেমিতে (ডিএসএ) আবেদন করেন। ১৯৭৪ সালে তৃতীয় দফায় তিনি সফল হন। ডিএসএতে তার এক সহপাঠীর মতে, তিনি ছিলেন একজন গড়পরতার ক্যাডেট।  গণতান্ত্রিক পালাবদল যখন শুরু হয় ২০১১ সালে তখন সেনাবাহিনীর দায়িত্ব নেন মিন অং হ্লেইং। ইয়াঙ্গুনের কূটনীতিকরা বলেন, সুচির প্রথম দফার মেয়াদে মিন অং হ্লেইং নিজেকে একজন স্পষ্টভাষী সেনা থেকে একজন রাজনীতিক হিসেবে পাল্টে ফেলেন। বিশেষ বিশেষ ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাত, সরকারি কর্মকান্ড এবং মঠে সফরের কর্মকাণ্ডগুলো তিনি ফেসবুকে প্রচার করতে থাকেন। এসবই নজরে পড়েছে তাদের।


২০১৭ সালে তার সেনাবাহিনী রাখাইনে রোহিঙ্গা মুসলিম সংখ্যালঘুদের ওপর নৃশংস নারকীয়তা সংঘটিত করে। এর আগে পর্যন্ত তার সরকারি প্রোফাইলে হাজার হাজার মানুষ ছিলেন ফলোয়ার। কূটনীতিক ও পর্যবেক্ষকরা বলেছেন, অন্য দেশগুলোতে যেসব রাজনৈতিক পালাবদল ঘটেছে তা নিয়ে পড়াশোনা করেছেন মিন অং হ্লেইং।  তিনি দেখেছেন ২০১১ সালে ক্ষমতার পালাবদলের ফলে লিবিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যে বিশৃংখল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, তা এড়ানোর প্রয়োজন। এর পর থেকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী প্রধান কখনোই ক্ষমতা ছাড়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। তাই তিনি পার্লামেন্টে সেনাবাহিনীর জন্য শতকরা ২৫ ভাগ আসন সংরক্ষিত রাখতে সক্ষম হয়েছেন, যা সু চি সরকারকে অনেকটা বিপজ্জনক অবস্থায় ফেলে দেয়। তাদের মতে, গত ৮ই নভেম্বর মিয়ানমারে যে ভোট হয়েছে, তাতে ভোটার তালিকায় ছিল ব্যাপক অনিয়ম। এ করণে সু চির দল বিজয় পায়। ২০১৬ সালে আরো ৫ বছরের জন্য নিজের ক্ষমতার মেয়াদ বৃদ্ধি করিয়ে নেন সেনাপ্রধান।  

কোন মন্তব্য নেই

Thankyou To Comment us

Blogger দ্বারা পরিচালিত.