যেভাবে প্রভাতফেরির সূত্রপাত - The News Lion

যেভাবে প্রভাতফেরির সূত্রপাত

 

ঢাকা প্রতিনিধি : ১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী শহীদ দিবস পালন করা হয় এবং লাল কাগজ দিয়ে একই স্থানে পূর্বের শহীদ মিনারের অনুরূপ একটি প্রতিকৃতি তৈরি করা হয়। এরপর সেটিকে কালো কাপড়ে ঢেকে দেয়া হয়। সেখান থেকেই প্রথমবারের মত প্রভাতফেরি বের করে ছাত্ররা। এভাবেই প্রভাতফেরির সূত্রপাত হয়। পরের বছর (১৯৫৪ সাল) একই রূপে আবারও প্রভাতফেরি বের করা হয় ২১ ফেব্রুয়ারিতে।  ১৯৫৪ সালের ১০ মার্চ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে ৩ রা এপ্রিল শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুক হক চার সদস্য বিশিষ্ট যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা গঠন করেন। ৯ মে এর অধিবেশনে তারা ঘোষণা দেন, তাদের ২১ দফা অনুযায়ী, শহীদ মিনার পুনঃনির্মাণ করা হবে এবং ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘শহীদ দিবস’ আখ্যা দেয়া হবে। কিন্তু তারা এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত করতে ব্যর্থ হয় এবং ৩০ মে এই সরকারের পতন ঘটে। 


তবে ১৯৫৪ সালে একটি ছোট আকারের স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয় যার উদ্বোধন করেন নাট্যগুরু নুরুল মোমেন। বড় আকারে শহীদ মিনার তৈরির কাজ শুরু হয় ১৯৫৭ সালে।  শহীদ মিনার (১৯৬৩-১৯৭১) : ১৯৫৬ সালে আবুল হোসেনের মুখ্যমন্ত্রী থাকাবস্থায় পূর্তমন্ত্রী আবদুস সালাম খান শহীদ মিনার নির্মাণের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে একটি স্থানকে বাছাই করেন। পরবর্তীতে সেখানে জনৈক মন্ত্রীর শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের কথা থাকলেও জনতার বিপুল আপত্তির মুখে তা না করে, ভাষাশহীদ রিকশাচালক আউয়ালের মেয়ে বসিরনকে দিয়ে শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করানো হয়।  ১৯৫৬ সালে এ. কে. ফজলুল হক ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টের উদ্যোগে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে পালিত হয় শহীদ দিবস এবং এতেই শহীদ মিনারের নির্মাণ প্রক্রিয়া বেগবান হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজের হোস্টেলের সম্মুখে শহীদ মিনার কমপ্লেক্স তৈরির পরিকল্পনা করা হয়। 


স্থাপত্য নকশার দায়িত্ব পান হামিদুর রহমান ও নভেরা আহমেদ। ১৯৫৭ সালের ৯ নভেম্বর এটি তৈরির কাজ শুরু হয়। সামরিক আইন জারির কারণে নির্মাণকাজ বিলম্বিত হয়। তবে ১৯৬২ সালে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আজম খানের নেতৃত্বাধীন কমিটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে চিঠি দিয়ে শহীদ মিনারের নকশায় পরিবর্তন এনে একে সংক্ষিপ্তাকারে শেষ করতে বলেন। ১৯৬৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষাশহীদ বরকতের মা হাসিনা বেগমের হাতে শহীদ মিনারটির স্মৃতিস্তম্ভের উদ্বোধন হয়। যদিও তখনো সম্পূর্ণ কমপ্লেক্সের কাজ সম্পন্ন হয়নি।  হামিদুর রহমান ও নভেরা আহমেদকে নিয়ে যে শহীদ মিনার তৈরির পরিকল্পনাটি নেয়া হয়েছিল তা হলো- কেন্দ্রীয় বেদীতে অর্ধ-বৃত্তাকার কলাম মা ও তার ভূপতিত সন্তানদের নির্দেশ করবে।


চোখে সূর্যের আলোর প্রতিফলন নির্দেশ করতে হলুদ ও গাঢ় নীলরঙা কাঁচ কলামগুলোতে বসানোর কথা ছিলো। মেঝেটি হওয়ার কথা ছিল মার্বেল পাথরের যেন এই কলামগুলোর ছায়াসমূহের সময়ক্রমে স্থান পরিবর্তন এতে দেখা যায়।  বেদীর নিচে বেজমেন্টে ১৫০০ বর্গফুট (১৪০ বর্গমিটার) এর একটি প্রাচীরচিত্রে উল্লেখ থাকার কথা ছিল ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের। বাংলা অক্ষরযুক্ত একটি রেইলিং সৌধটির সামনে স্থাপনের কথা ছিল। আর লাল ও কালো রঙ্গা দুইটি পায়ের ছাপ অঙ্কনের কথা ছিলো যা ভাষা আন্দোলনের পক্ষে বিপক্ষে অবস্থান নেয়া দুটো ভিন্ন দলকে নির্দেশ করে। একটি চোখ আকৃতির ঝরণা, একটি জাদুঘর এবং পাঠাগারও হামিদুর রহমানের নকশা পরিকল্পনায় ছিল। 


 হামিদুর রহমান এমনভাবে শহীদ মিনারের নকশা করেছিলেন যাতে তা এই গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলের আবহাওয়ায় টিকে থাকতে পারে। সামরিক শাসন জারির পূর্বে ভিত্তি, বেদী, কিছু কলাম, রেইলিং, পায়ের ছাপ, দেয়ালে আঁকা ছবি ও অন্যান্য কিছু কাজ সম্পন্ন হয়েছিল। ১৯৬৩ সালে যখন উদ্বোধন করা হয় তখন হামিদুর রহমানের নকশার বেশিরভাগ কাজই অসম্পূর্ণ ছিল।  এরপর ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ গণহত্যা অভিযান অপারেশন সার্চলাইটর সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী শহীদ মিনারটি গুঁড়িয়ে দেয় এবং ধ্বংসাবসের ওপর ‘মসজিদ’লেখা সাইনবোর্ড দেয়।


স্বাধীনতা পরবর্তীতে বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর নেতৃত্বে পুনরায় শহীদ মিনার নির্মাণ কমিটি গঠন করা হয়। তারা ১৯৬৩ সালের নকশার উপর ভিত্তি করে দ্রুত সময়ের মধ্যে শহীদ মিনার তৈরি করতে সম্মত হন। এরপর ১৯৭৬ সালে নতুন নকশা অনুমোদিত হয় সেখানে ১৫০০ বর্গফুটের ভিত্তির ওপর চারটি ক্ষুদ্র ও একটি বৃহৎ কলাম মা ও তার ভূপতিত সন্তানদের নির্দেশ করে। এর পেছনে থাকবে একটি লাল সূর্য। এগুলো নির্মিত হয়েছিল উজ্বল মার্বেল পাথর দ্বারা। 


সিঁড়িতে ব্যবহার করা হবে সাদা রং যা একটি শুভ্র সৌম্য সৌন্দর্য এনে দেবে। প্রাচীরে রং করে লেখা থাকবে বিখ্যাত কবিদের কবিতা। কিন্তু এই পরিকল্পনা যথার্থরূপে বাস্তবায়িত করা সম্ভব হয়নি। নির্মাণকালে কলামগুলোর দৈর্ঘ্য পরিকল্পনানুসারে ধার্যকৃত দৈর্ঘ্যের থেকে কম হয়ে যায় এবং মুখ্য তথা বৃহৎ কলামটির মাথা পরিকল্পনার চেয়ে বেশি বাঁকানো করে তৈরি করা হয়।  


 বর্তমান শহীদ মিনার: সবশেষ ১৯৮৩ সালে স্থপতি এস.এইচ.এম. আবুল বাশারের নেতৃত্বে শহীদ মিনারের এলাকা সম্প্রসারণ করে ত্রিকোণ থেকে চতুর্ভুজ আকারে তৈরি করা হয়। এই নতুন পরিকল্পনায় হামিদুর রহমানের নকশার দেয়ালচিত্র পরিকল্পনা বাতিল ও বেইজমেন্টের অংশটি বন্ধ হয়ে যায়। যা শহীদ মিনারের বর্তমান রূপ। বর্তমান শহীদ মিনারের উচ্চতা ১৪ মিটার (৪৬ ফুট)।   সরকার ২০১০ সালের ২৫ আগস্ট হাইকোর্ট শহীদ মিনারের ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণার্থে নয়টি নির্দেশনা দেন এবং জাদুঘর ও পাঠাগার নির্মাণের নির্দেশ দেন।


কোন মন্তব্য নেই

Thankyou To Comment us

Blogger দ্বারা পরিচালিত.