বাঙালির প্রথম মহিলা ডাক্তারের ইতিহাস
করোনাকালে ডাক্তারদের লড়াইকে সাধারন নেতা থেকে রাষ্ট্রনেতা সবাই কুর্নিশ জানাচ্ছেন। এমনও এক সময় ছিল যখন বাঙালির প্রথম মহিলা ডাক্তারকে তাঁর উত্তরণের পথে দেওয়া হয়েছিল ইচ্ছাকৃত বাধা, শুনতে হিয়েছিল বারবণিতার গঞ্জনা। তবুও তিনি লড়াই থেমান নি। জয়ী হয়েছিলেন কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়। প্রথম বাঙালি মহিলা চিকিৎসক, পাশাপাশি প্রথম মহিলা স্নাতক। ১৮৬১ সালের ১৮ জুলাই এমন দিনেই তাঁর জন্ম। কাদম্বিনী শুধু ইউরোপীয় চিকিৎসাবিদ্যায় শিক্ষিত প্রথম বাঙালি তথা দক্ষিণ এশীয় মহিলাই নন, চন্দ্রমুখী বসুর সাথে তিনিই সমগ্র ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্নাতক।
ব্রাক্ষ্ম সমাজের অনুপ্রেরণায় কাদম্বনীর বাবা ব্রজকিশোর বসু মেয়েকে শিক্ষিত করে তুলতে উদ্যোগী হন। কাদম্বিনীর শিক্ষা শুরু হয় ঢাকার ইডেন মহিলা বিদ্যালয়ে। পরবর্তীতে তিনি ভর্তি হন বালিগঞ্জের বঙ্গ মহিলা বিদ্যালয়ে এবং ১৮৭৮ সালে বেথুন কলেজিয়েট স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাস করেন। অতঃপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি এবং চন্দ্রমুখী বসু ১৮৮১ সালে এফএ এবং ১৮৮৩ সালে প্রথম ভারতীয় মহিলা হিসাবে বিএ পাস করেন। এফএ পাশ করেই তিনি কলকাতা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার আবেদন জানান। কিন্তু পুরুষ অধ্যুষিত জগতে এক মেয়ের অনুপ্রবেশ, আসতে থাকে বাধার পর বাধা। ইতিমধ্যেই ১৮৮৩ সালে তার বিয়ে হয় বিখ্যাত সমাজ সংস্কারক ও নারী প্রগতির এক স্তম্ভ দ্বারকানাথ গাঙ্গুলীর সাথে। তাদের সম্মিলিত প্রয়াসেই ১৮৮৪ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজে মাসিক ২০ টাকা বৃত্তি নিয়ে ভর্ত্তি হন কাদম্বিনী।
কিন্তু এখান থেকেই শুরু হয় সমাজের এক স্থবির অংশের সাথে কাদম্বিনীর লড়াই। আর এই লড়াইয়ের ফল স্বরূপই বোধহয় ১৮৮৮ সালের ফাইনাল পরীক্ষায় তাকে ফেল করিয়ে দিলেন এক বাঙালি অধ্যাপক, তাও মাত্র ১ নম্বরের জন্য! অবশেষে বহু ঝামেলার পর ঊর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপের পর তাকে দেওয়া হল কোনওরকমে একটি ডিপ্লোমা ডিগ্রী- জি.এম.সি.বি।
ফ্লোরেন্স নাইটেঙ্গেলের বিশেষ সুপারিশে ১৮৮৮ সালে মাসিক ৩০০ টাকা বেতনে তিনি যোগ দেন লেডি ডাফরিন হাসপাতালে। কিন্তু একজন মেয়ে এত সহজে ডাক্তার হয়ে যাবেন ! তাই এবার বিরোধিতা শুরু হল আরো বড় ভাবে। তাকে নিয়ে শুরু হল ঠাট্টা। ডাক্তারী পেশায় নির্দিষ্ট সময় থাকে না বলে না কাদম্বিনী গাঙ্গুলীকে রোগীদের সাহায্যার্থে রাত দিনের যেকোনো সময় হাসপাতালে বা রোগীদের বাড়িতে যেতে হতো। তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজ এ বিষয়টি ভালো চোখে দেখেনি।।
‘বঙ্গবাসী’ পত্রিকার দাপুটে সম্পাদক মহেশচন্দ্র পাল সমস্ত শালীনতার সীমা ছাড়িয়ে ডা. কাদম্বিনীকে তুলনা করলেন ‘স্বৈরিণী’ এমনকি ‘বারবণিতা’র সঙ্গেও। মহেশচন্দ্র পাল কাদম্বিনীকে নিয়ে ‘অশ্লীল’ কার্টুন ছাপান। কাদম্বিনী এবং দ্বারকানাথ শুরু করলেন আইনি লড়াই। অতঃপর সম্পাদকের ৬ মাস জেল এবং ১০০ টাকা জরিমানা ধার্য্য হল।
দ্বারকানাথের উৎসাহে ১৮৯২ সালে বিলেতে যান কাদম্বিনী।১৮৯২ সালে সমুদ্র পেরিয়ে উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশযাত্রা করলেন কাদম্বিনী। ফিরলেন এল.আর.সি.পি (এডিনবরা), এল.আর.সি.এস (গ্লাসগো) এবং জি.এফ.পি.এস (ডাবলিন) উপাধি নিয়ে। এরপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে।
Post a Comment