ধীরেন দে সম্পর্কে কিছু জানা অজানা কথা
দি নিউজ লায়নঃ ময়দানি মিথ, ধীরেন দে নাকি ছিলেন উন্নাসিক৷ তাঁকে সব সময়ই দেখা যেত নাকে রুমাল চাপা দিয়ে৷ আসল সত্যিটা হল, মোহনবাগানের দোর্দণ্ডপ্রতাপ সচিব ধীরেনবাবুর ছিল মারাত্মক ধুলোয় অ্যালার্জি৷ তাই তাঁকে দেখা যেত রুমাল নাকে দিয়ে৷ প্রায় সাত দশক মোহনবাগান ক্লাবের সাথে সম্পর্ক ছিলো ধীরেন দে -র l এই সম্পর্ক শুরু হয়েছিলো ১৯২৭ সালে l
ধীরেন দে রা তখন থাকতেন জোড়া বাগান অঞ্চলে l তখন ক্রিকেট খেলতেন অরোরা ক্লাবে l মোহনবাগানের সাথে একটি ফ্রেন্ডলি ম্যাচ ছিলো অরোরা ক্লাবের l তখন তার বয়স ছিলো পনেরো -ষোল l সেই ম্যাচে তাঁর খেলা দেখে মাতাল মিত্তির (এস -কে -মিত্র )তাঁকে মোহনবাগানে খেলার প্রস্তাব দেন lসে বছরের পরের বছর ১৯২৯ সালে তত্কালীন মোহনবাগান সচিব জে এন বসুর ডাকে শেষ পর্যন্ত ক্রিকেটার হিসেবে ধীরেন দে মোহনবাগান ক্লাবে যোগ দেন l
ভালো গোলকিপিং ও করতেন ধীরেন ,ওই সময় ক্লাবের হয়ে বেশ কিছু ফুটবল ম্যাচও খেলেছিলেন তিনি l যদিও ক্রিকেটার হিসেবেই বেশী পরিচিত ছিলেন l ১৯৩৫ সালে চার -পাঁচ বছর ক্রিকেট খেলার পর ক্লাব কর্তারা ধীরেন দে কে ক্লাব প্রশাসনে নিয়ে এলেন , ক্রিকেট বিভাগের দ্বায়িত্বে , তখন ধীরেন কে দেজ মেডিকেলে দাদার সাথে যেতে হয় l ব্যাবসা সামলাতে হয় l দাদাই মোহনবাগানের প্রতি ধীরেনের উত্সাহ দেখে ব্যাবসা থেকে ধীরেন কে একটু ছাড় দিলেন আর ধীরেনও মেতে গেলেন ক্রিকেট নিয়ে l এভাবে বেশ কয়েকবছর কেটে গেলো l ক্লাবের নির্বাচন এলো l
হাওয়া খুব গরম l ডাঃ বিধান চন্দ্র রায় তখন মুখ্য মন্ত্রী l ধীরেন দে রা সবাই গেলেন তাঁর কাছে , উনি বললেন "এমন একজনকে সচিব করবেন , যিনি মোহনবাগান ক্লাবের যোগ্য "" নির্বাচন হলো l এস -এন বসু সচিব আর ধীরেন দে সহ সচিব , কয়েক বছর পর বসু সাহেব মারা গেলেন l কিন্তু ধীরেন দে তখনই সচিব হতে চাইলেন না l সচিব হলেন বলাই মিত্র l কাজকর্ম অবশ্য সব ধীরেন দে ই করতেন l সে সময় সব ধরনের টিম করা নিয়ে ধীরেন মেতে গেলেন l
ধ্যানচাঁদ কে বললেন কিছু হকি প্লেয়ার দিতে l কেশব দত্ত তখন মোহনবাগানে খেলতেন , ধীরেন দে র আমলে হকি তে মোহনবাগানের মতো রেকর্ড কোন ক্লাবের নেই l বেটন , আগা খাঁ , অল ইন্ডিয়া গোল্ড কাপ সব কিছু মোহনবাগান চ্যাম্পিয়ন হয়েছে l ক্রিকেটে সি -কে -নাইডু , মুস্তাক আলি থেকে শুরু করে হেন নামী ক্রিকেটার নেই , যাঁরা মোহনবাগান ক্লাবে খেলেনি l পেলে কে কি ভাবে খেলতে রাজি করিয়েছিলেন ধীরেন দে -- সে এক কাহিনী , সে সময় নিউইয়র্কে ধীরেন দে র বন্ধু ছিলেন ব্যানার্জি বলে l
তাঁর মাধ্যমে ধীরেন গেলেন পেলের কাছে , পেলে চার কোটি টাকা চেয়ে বসলো l ধীরেন দে র মাথায় হাত l কি করবেন ? হঠাত্ পেলেকে বললেন , ""তুমি জীবনে কখনো গরীব মানুষ দেখেছো ? লক্ষ --লক্ষ--- কোটি -কোটি ......এমন লোক , যারা দারিদ্র কয়েকদিনের জন্যে ভুলে যাবে , যদি তোমায় একবার দেখে "" এই কথা শুনে কি জানি কেনো পেলে রাজি হয়ে গেলো তবে শর্ত , ওর বউকে একটা হীরের নেকলেস দিতে হবে l ধীরেন দে ততক্ষনাত রাজি হয়ে গেলেন l
হাঙ্গেরি থেকে দুর্ধর্ষ তাতাবানিয়া টিম কে আনা , তখন ইস্টবেঙ্গলের সাথে মাঠ শেয়ার করতে হত , এই অবস্থা থেকে ক্যালকাটা ক্লাবের কর্নধার ওয়েলসের নাগরিক জন ব্রাইয়েরে সাথে কথা বলে তাদের পার্টনার হয়ে ক্যালকাটা মাঠকে নিজেদের মাঠ বানানো , ইস্টবেঙ্গলের সাথে থাকা নিজেদের তাঁবু দশ হাজার টাকা নিয়ে এরিয়ানের জগন্নাথ কোলের কাছে বিক্রি করে সেই টাকায় ক্যলকাটা ক্লাবের গ্যালারি সারিয়ে নেওয়া , এবং ধীরে ধীরে আরো সিট বাড়ানো হলো কংক্রিটের গ্যালারিতে l এবার সেনাবাহিনী গ্যালারি ভাঙতে চলে এলো , তখন মোহনবাগান প্রেমী রাজ্যপাল পদ্মজা নাইডুর মাধ্যমে বাবু জগজীবন রামকে ধরে সরাসরি ইন্দিরা গান্ধীর সাথে কথা বলে গ্যালারি ভাঙা আটকানো হলো l ধীরেন দে র কথায় মোহনবাগান নামটাই সব , অনেক কাজ হালকা করে দেয় l
তারপর আজকের এই সুদৃশ্য লন , কোন ক্লাবের নেই ভারতে , সেই লন তৎকালীন ডি সি হেড কোয়াটার্স কে বলে ক্লাবের পেছনের দিকটা অনেকটা গঙ্গার দিকে বাড়িয়ে নিয়েছিলেন l মোহনবাগান ক্লাব কোনদিন ধীরেন দে র ঋন শোধ করতে পারবে না , ক্লাবের কাজে এতই ব্যাস্ত থাকতেন চির কুমার হয়ে ক্লাবের জন্যে নিজের সব দিয়ে গেছেন ধীরেন দে আর সব থেকে বড় কথা সততা শুধু মাত্র সততা দিয়েই ক্লাবকে ভালোবেসে কাজ করে গেছেন .... আজ মোহনবাগান যা হয়েছে তার অনেকটা কৃতিত্ব ধীরেন দে র l এতো অল্প পরিসরে ধীরেন দে কে বর্ননা করা যাবেনা , উনি অবর্ননীয় ,মোহনবাগানের মহান ইতিহাস তিনি নিজেই । আজ মৃত্যুবার্ষিকীতে প্রনাম জানাই ধীরেন দে কে

Post a Comment