রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক জীবন
দি নিউজ লায়ন; বাঙালির প্রাণপুুরুষ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫ বৈশাখ কলকাতায় জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে জন্ম গ্রহণ করেন। বাঙালির আত্মিক মুক্তি ও সার্বিক স্বনির্ভরতার প্রবক্তা, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উৎকর্ষের মূল নায়ক কাব্যগীতির শ্রেষ্ঠ স্রষ্টা, দ্রষ্টা ও ঋষি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। যাঁর লেখা, দর্শন, চিন্তা, চেতনা তথা বহুমাত্রিক আলোকচ্ছটায়, ঔজ্জ্বল্য ও মহিমায় বাঙালি জাতিসত্তা হয়েছে মহিমান্বিত ও গৌরবান্বিত।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একজন বাঙালি ব্যক্তিত্ব যিনি তিনটি দেশের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা। ভারত ও বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত যথা 'জন গণ মন' এবং 'আমার সোনার বাংলা' দুটোই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা। এর পাশাপাশি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের এক শিক্ষার্থী নাম আনন্দ সমরাকুন, উনি রবি ঠাকুরের লেখা নমো নমো শ্রীলঙ্কা মাতা- গানটি সিংহলী ভাষায় অনুবাদ করেন। যা পরবর্তীকালে শ্রীলঙ্কার জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।
চার দেওয়ালে আবদ্ধ প্রথাগত শিক্ষার প্রচলিত ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার নিজস্ব একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যেখানে তিনি চেয়েছিলেন মানবতা জাতি এবং ভূগোলের সীমা ছাড়িয়ে প্রাচীণ ঐতিহ্য মেনে প্রকৃতির মুক্তাঙ্গনে বসে নেওয়া যায় প্রকৃত শিক্ষা। বিশ্বভারতীতে তিনি তাই খোলা মাঠে গাছের নিচে বসে পড়াতেন ছাত্র-ছাত্রীদের। ১৯১২ সালে বাংলার বীরভূম জেলার শান্তিনিকেতনে শুরু হয়েছিল বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্র। নোবেল পুরস্কারের সঙ্গে প্রাপ্ত নগদ অর্থ বিশ্বভারতীকে কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় হিসাবে গড়ে তোলার কাজে ব্যবহার করেছিলেন।
এছাড়াও তিনি ব্যক্তিগত জীবনে তৎকালীন রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত না থাকলেও, কংগ্রেসের বিভিন্ন অধিবেশনে অংশগ্রহণ করতেন কবিগুরু৷ বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বহু কবিতা রচনা করেছিলেন এবং পথে নেমে সকলের সঙ্গে গলা মিলিয়ে গেয়েছিলেন একের পর এক দেশাত্মবোধক গান৷ যেমন ‘বাংলার মাটি বাংলার জল, বাংলার বায়ু বাংলার ফল...'৷ আর এহেন গানে অথবা কোনো কোনো কবিতার মধ্যেই স্বদেশীরা খুঁজে পেয়েছিলেন দেশের জন্য আত্মদানের উদ্দীপনা৷ যদিও, অসহযোগ আন্দোলনের একটা পর্যায়ে মহাত্মা গান্ধীকে লেখা খোলা চিঠিতে অহিংস আন্দোলন সম্পর্কে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন কবি৷ তাঁর লেখনী থেকে উঠে এসেছিল, ‘‘আপনার শিক্ষা বিধাতার সাহায্য নিয়ে অহিংসার পথে লড়াইয়ের শিক্ষা৷ কিন্তু, এমন লড়াই শুধু নায়কদের জন্য সম্ভবপর, সাধারণের জন্য নয়৷
গান্ধী ও কবিগুরুর কাজের মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান থাকলেও, গান্ধীর দর্শন টানতো রবীন্দ্রনাথকে৷ আর কবিকেও অসম্ভব শ্রদ্ধা ভরে দেখতেন মহাত্মা৷ তাই ১৯১৯ সালে পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড দু'জনকেই মর্মান্তিক আঘাত করেছিল৷ ঘটনাটির প্রতিবাদে, ব্রিটিশ প্রদত্ত ‘স্যার' উপাধি ত্যাগ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ৷ তারপর ১৯২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ইউরোপ থেকে ফিরে, কলকাতায় তিনি প্রায় চার ঘণ্টা রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছিলেন গান্ধীর সঙ্গে৷ অনেকের মতে অবশ্য, ঐ দুই মহাপুরুষের মধ্যে সেই দীর্ঘ আলোচনায় বিশেষ কোনো ফল হয় নি৷ কারণ তার পর-পরই, অসহযোগ আন্দোলনের ইন্ধন সন্ধানে বের হন গান্ধীজি৷ এবং রবীন্দ্রনাথ মন দেন বিশ্ববিদ্যালয় গঠনে৷
সে সময় (১৯২০-১৯২২) ভারতে কংগ্রেসের অসহযোগ আন্দোলন, মুসলমানদের খেলাফত আন্দোলন এবং শহরের শ্রমিক ধর্মঘটসহ বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষক সংগ্রাম এক উত্তুঙ্গ অবস্থায় পৌঁছেছিল৷ স্বাভাবিক কারণেই, এসব আন্দোলন এবং বিদ্রোহ নির্মম ও হিংস্রভাবে দমন করছিল ব্রিটিশ সরকার৷ চলছিল কংগ্রেস সদস্যদের বিরুদ্ধে নির্যাতনও৷ একে একে আটক হয়েছিলেন মতিলাল ও জওহরলাল নেহেরু, চিত্তরঞ্জন দাশসহ কংগ্রেসের হাজারো নেতাকর্মী৷ এরপর একই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে চাষীরা একটি থানা পুড়িয়ে দিলে, তাঁর ‘অহিংস' আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন গান্ধী৷ মার্চে তাঁকেও গ্রেপ্তার করার হয়৷ আর তারই পটভূমিতে ‘মুক্তধারা' সৃষ্টি করেন কবিগুরু৷

Post a Comment