খুশি থাকা মানে ভাল থাকা - The News Lion

খুশি থাকা মানে ভাল থাকা

Indian Cooking w/ Yamini: Taste of Workshop - Indian Cooking ...



লকডাউনের তীব্র প্রভাব পড়ছে আমাদের রোজকার জীবনযাত্রায়। বিজ্ঞান বলে, সমগ্র জীবজগতের মধ্যে একমাত্র মানুষই পারে সব পরিস্থিতিতে মানিয়ে নিতে ও সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে চলতে। তাই এই সময় ভাল থাকার উপায়গুলি রপ্ত করতে পারলে আমরা আরও একটু বেশি সুরক্ষিত থাকব।
এই প্রসঙ্গে বলি, সুস্থ শরীর ও মনের চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে জীবনযাত্রার যে চারটি স্তম্ভের ওপর, সেগুলি হল সঠিক আহার, সঠিক ব্যায়াম, ভাল মানের পর্যাপ্ত ঘুম ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। এই সময়ের খাবার হতে হবে কম ক্যালরিযুক্ত, সহজপাচ্য, পুষ্টিগুণে ভরপুর, অনুত্তেজক, সহজে পাওয়া যায় এমন এবং যা রসনা তৃপ্তি দেয়। তবে অবশ্যই সেগুলি সাশ্রয়ী ও সহজে মজুদ রাখা যায় এমন হতে হবে। এক কথায় কেনার সময় অর্থের সাথে একটু বুদ্ধি খরচ করলেই মুশকিল আসান। আসুন এক নজরে দেখে নিই রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে মজবুত করার জন্য সারাদিনের সুষম আহারের খাদ্য তালিকা।
প্রথমেই রিফাইন্ড খাবারগুলিকে বাদ দিন। ময়দার পরিবর্তে খান গোটা গমের আটা, ডালিয়া, ওটস, ভাত, রুটি, চিড়ে ,মুড়ি ,ভুট্টা, জোয়ার, বাজরা, রাগি প্রভৃতির ওপর জোর দিন। এগুলি পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ ও প্রচুর ফাইবারের উৎস।


দু’নম্বরে ডাল থেকে তৈরি খাবার; যে কোনও গোটা বা ভাঙা ডাল, বীজ ও বাদাম জাতীয় খাবার রাখতে হবে। কাবলি ছোলা, সবুজ মুগ কলাই, ছোলা, সয়াবিন উল্লেখযোগ্য। এগুলি দ্বিতীয় শ্রেণির প্রোটিনের উৎকৃষ্ট উৎস। সয়াবিন রান্নার আগে প্রেসার কুকারে সেদ্ধ করে জল ফেলে তার পরে নাগেটগুলি রান্নায় ব্যবহার করুন। তিন নম্বরে থাকবে সমস্ত মরসুমি শাক-সবজি ও ফল। চার নম্বরে রাখুন মাছ, মুরগি অথবা ডিম তার সাথে দুধ, দই বা ছানা। পাঁচ নম্বরে থাকুক রান্নার তেল ও অন্যান্য সামগ্রী।খাদ্যব্যবস্থা সুষম রাখতে চাই পরিকল্পনা ও তার সঠিক পরিচালনা। কারণ সুষম খাদ্য আপনাকে এনে দেবে সেই সমস্ত খাদ্য উপাদান যেগুলি আপনার শরীর ও মনকে সুস্থ ও সবল রাখবে। ভিটামিন এ, সি, ই আর ডি মানবদেহে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। খনিজ লবণের মধ্যে জিংক, সেলেনিয়াম, আয়রন ও ক্যালসিয়াম মজবুত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরিতে অনস্বীকার্য।
এবার জেনে নিন কম খরচে ঘরে বসে কীভাবে এগুলি পাওয়া যাবে। ভিটামিন সি সবথেকে বেশি থাকে আমলকি, পেয়ারা প্রভৃতি ফলে। এছাড়া যে কোনও লেবুজাতীয় ফলেও ভিটামিন সি পাওয়া যায়। এগুলো হাতের কাছে সব সময় না পেলে অঙ্কুরিত ছোলা, সবুজ টাটকা শাক, পাতি লেবুও খেতে পারেন। মাছের তেল অত্যন্ত উপকারী, এতে ভিটামিন এ, ভিটামিন ডি, ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড আছে। ভিটামিন এ অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট হিসেবে কাজ করে। ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড হৃদ্ রোগীদের জন্য ভাল। পাশাপাশি ভিটামিন এ, সি এবং ই আমাদের এজিং প্রসেসকে স্লো ডাউন করে।



শক্তপোক্ত হাড়ের জন্য ভিটামিন ডি অত্যন্ত দরকারি। দুধ, ছোট মাছ ও দই থেকে পাবেন প্রচুর ক্যালসিয়াম। আয়রনের অভাব থাকলে মাছ, মাংস অথবা ডিম খাদ্য তালিকায় রাখতেই হবে। এগুলি ছাড়াও কিছু কার্যকরী পুষ্টি উপাদান বা ফাংশনাল নিউট্রিয়েন্ট আছে যা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় বিশেষ ভূমিকা পালন করে। যেমন তরমুজের লাল অংশ লাইকোপেন প্রদাহ বিরোধী ও হার্টের পক্ষে উপকারী। সবুজ ফুলকপিতে এন অ্যাসিটাইল সিস্টিন থাকে, যার অ্যান্টি-ভাইরাল অ্যাক্টিভিটি আছে।
কুমড়ো আবার ভিটামিন এ-তে সমৃদ্ধ এবং এর বীজে প্রচুর জিঙ্ক আছে যা ইমিউন সিস্টেমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই এখন থেকে কুমড়োর বীজগুলি রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ করুন। খাবার সময়ে খোসা ছাড়িয়ে বাদামের মতো খেতে পারেন। বিটের বিটুইন দেহে রক্ত সঞ্চালন বাড়িয়ে স্ট্যামিনা বাড়াতে সাহায্য করে, রসুনের অ্যালিসিন, হলুদের কারকিউমিন, টমেটোর লাইকোপিন, তুলসীর ইউগেনোল– এরা সবাই ইমিউনো মডুলেটর ই বায়ো অ্যাকটিভ কম্পাউন্ড অর্থাৎ রোগ প্রতিরোধী উপাদান।


মাছ, ডিম, মুরগির মাংস, দুধ প্রভৃতি থেকে পাবেন প্রথম শ্রেণির প্রোটিন। নিরামিষাশীরা চাল ডালের মিশ্রণ রান্নায় ব্যবহার করলে প্রোটিনের গুণগত মান বাড়বে। খিচুড়ি, ডালপুরি, ছাতুর রুটি, বাদাম মুড়ি বা চিঁড়ে বাদাম, ইডলি, ধোসা প্রভৃতি খাবারগুলিতে চাল-ডাল একসঙ্গে খাওয়া যায়। তাই এগুলি বেশি উপকারী। নিরামিষাশীরা এর সাথে রাখুন সয়াবিন, এটি উচ্চ প্রোটিন যুক্ত খাদ্য।
এই সময়ে বাড়িতে রান্না করে খাবার অভ্যাস নিজেদের অজান্তেই আমরা তৈরি করছি। চেষ্টা করা ভাল, তা যেন পরবর্তী সময়েও অটুট থাকে। খুব প্রয়োজন ছাড়া বাইরের খাবার যেন আমরা না খাই, কারণ বাইরের খাবারের গুণগত মান কম হয় এবং তা শরীরের জন্য নিরাপদ নয় মোটেই।


দই একটি সুপার ফুড। এর প্রি এবং প্রোবায়োটিক পাকস্থলীর স্বাস্থ্য ভাল রাখে এবং দেহে উপকারী ব্যাকটেরিয়া সরবরাহ করে। সেইসঙ্গে উচ্চ ফাইবার যুক্ত খাদ্য খেতে হবে: ওটস, ডালিয়া, গোটা ডাল, অঙ্কুরিত ছোলা ও ফল যোগ করুন খাদ্যতালিকায়। এগুলি একদিকে যেমন আপনার ওজন কমাতে সাহায্য করবে তেমনি অন্যদিকে এনে দেবে রসনা তৃপ্তির অনুভূতি।
হার্বাল চা তৈরি করুন আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বাড়িয়ে তুলতে। আপনার দৈনিক চায়ের পাতার সঙ্গে থাকবে তুলসী পাতা, আদা, লেমনগ্রাস, লবঙ্গ, দারচিনি। এসবের যে কোনও এক বা একাধিক উপাদান মিশিয়ে লিকার বানান, চিনির বদলে ব্যবহার করুন যষ্টিমধু। এখন হাতের কাছে থাকসেও চিনি ছাড়া খাবার অভ্যাস গড়ে তুলুন| দিনে তিন থেকে চার লিটার জল খান, এর মধ্যে এক লিটার ডিটক্স হিসাবে খান।


সারাদিনের খাবারকে তিন থেকে চারটি সমান ভাগে ভাগ করে খান। রান্নায় নুন, তেল ও মশলা ব্যবহারের পরিমাণ কমান। এতে ওজন ও রক্তচাপ দুটোই নিয়ন্ত্রণে থাকবে আর খাবার হবে লঘুপাচ্য। এই সময়ে আমরা সবাই কম-বেশি মানসিক চাপের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, রক্তচাপ বেড়ে যাওয়াটা একেবারেই স্বাভাবিক একটা ঘটনা। তাই রক্তচাপের দিকে নজর রাখুন| খাদ্যের মাধ্যমে ভাইরাস সংক্রমণের কোন তথ্য এখনও আমরা পাইনি, তবু অন্যান্য পেটের সংক্রমণ এড়াতে বাজার থেকে নিয়ে আসা সামগ্রী প্রথমে রানিং ওয়াটার ও পরে পানীয় জলে ভাল করে ধুয়ে শুকিয়ে এয়ারটাইট পাত্রে ভরে রেফ্রিজারেটরে সংরক্ষণ করুন । সবজি, ফল অনেক দিন টাটকা থাকবে, তাদের পুষ্টিগুণ বজায় থাকবে।


আর একটি শর্ত হলো ভাল ঘুম। সকালে নরম সূর্যের আলোয় হালকা ব্যায়াম করুন আধ ঘণ্টা। তাহলে রাতে স্লিপ হরমোন তৈরি হবে ভাল ভাবে। শুতে যাওয়ার দু’ঘণ্টা আগেই সেরে রাখুন ডিনার। শোয়ার সময়ে খান এক কাপ উষ্ণ দুধ ও এক চামচ মধু। এটি সিডেটিভ হিসেবে কাজ করে। ঘুমের সমস্যা বেশি হলে খেতে পারেন স্লিপ টি, উপকার পাবেন। শুতে যাওয়ার এক ঘণ্টা আগে ল্যাপটপ ও মোবাইলের কাজ বন্ধ করুন। হালকা মেডিটেশন করলে ভাল ঘুম হবে।

সব শেষে বলি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি কিন্তু হল ভাল থাকার আসল চাবিকাঠি। আজ আর ‘সময় নেই’– এই অজুহাত দিয়ে না পালিয়ে আসুন গড়ে তুলি সঠিক জীবন যাপনের অভ্যাস। এটাই যে কোনও ভালো অভ্যাস গড়ে তোলার সুবর্ণ সুযোগ। অলসতা ছেড়ে আমরা যদি প্রতিদিন একটু শরীরচর্চা করার অভ্যাস গড়ে তুলি, তা ভবিষ্যতেও আমাদের সঙ্গে থেকে যাবে। নিজের ভাল লাগার বিষয়, গান, নাচ, ছবি আঁকা, আবৃত্তি, লেখা, বই পড়া, রান্না বা হাতের কাজ– যাই হোক না কেন একটা রুটিন সময় রাখি সেই কাজ করার জন্য।


সুযোগ যখন আছে তখন সবাই একসঙ্গে খাই ও একে অন্যের সান্নিধ্য উপভোগ করি। এতেই তৈরি হবে আনন্দময় অন্তর্জগৎ ও তাতে কমবে যাবতীয় মানসিক চাপ। স্ট্রেস হরমোনের উৎপাত কমবে। বাড়বে হ্যাপি হরমোন অক্সিটোসিন, ডোপামিন এবং সেরোটোনিনের পরিমাণ, যা পরোক্ষে বাড়াবে আমাদের ইমিউনিটি।

খুশি থাকা আসলে ভাল থাকাও বটে। তাই এভাবে পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা সময়টিকে যদি কাজে লাগিয়ে আমরা আমাদের জীবনযাপনকে রিসেট করে নিই, তবেই আমরা বলতে পারব আমরা সত্যিই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব যারা সব সমস্যা থেকেই ভাল কিছু শেখে। সবাই ভাল থাকুন, সুস্থ থাকুন, ঘরে থাকুন।

কোন মন্তব্য নেই

Thankyou To Comment us

Blogger দ্বারা পরিচালিত.