এক ভয়ার্ত অভিজ্ঞতা
দি নিউজ লায়নঃ আজ আপনাদের সামনে এক রাতের ভয়ার্ত অভিজ্ঞতা তুলে ধরবো। অনেকটা অ্যাডভেঞ্চারের মতো। সময়টা ১৯৯৮ সাল। ঘুটঘুটে অন্ধকার। গা ছমছম করা ভয়ার্ত পরিবেশ। এমন এক রাতে পাড়ি দিয়েছিলাম সাড়ে সাত মাইল পাহাড়ি পথ। জঙ্গলাকীর্ণ আঁকাবাঁকা মেঠোপথ ধরে একা পাড়ি দেয়া ভয়ঙ্কর রাতের কথা মনে পড়লে এখনো গা শিউরে ওঠে। শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যায়। নদী পাড়ি দিয়ে অনেকটা সময় পায়ে হেঁটে দুর্গম পাহাড়ি গ্রাম আনন্দপুরে পৌঁছতে রাত হয়ে গেল।
চাকরি ও পড়াশোনার সুবাদে কেউ আনন্দপুরের গ্রামের বাড়িতে থাকে না। সকলেই ময়মনসিংহ শহরে থাকে। অতীতের স্মৃতি আঁকড়ে ছায়া সুনিবিড় বাড়িটি পড়ে থাকে শূন্যতায়। ছুটিছাটায় বেড়াতে গেলেই কেবল বাড়িটি পূর্ণতা পায়। মাটির ঘর। চারপাশে গাছগাছালিতে ভরা। বাজার থেকে হালকা কিছু খেয়ে এসেছিলাম। তালা খুলে আর দেরি নয়, সারাদিন পথে ঝক্কি-ঝামেলা কম যায়নি। কুপি-বাতি জ্বালিয়ে ক্লান্ত দেহখানি বিছানায় সঁপে দিলাম। গভীর এক ঘুমে সকাল হয়ে গেল।
সকালে উঠে বিস্ময় চোখে দেখতে থাকলাম প্রকৃতির সৌন্দর্যে মোড়ানো আনন্দপুরের অপরূপ সৌন্দর্য। যেন প্রকৃতি আপন মহিমায় সাজিয়ে রেখেছে রাঙামাটির এই গ্রামটিকে। লালমাটির আঁকাবাঁকা মেঠোপথ আর ঘরবাড়ি-গাছপালা পেরিয়ে অন্যকোনো পাহাড়ি গ্রামে চলে গেছে। নানা জাতের গাছগাছালিতে নানা প্রজাতির পাখির কিচিরমিচির সুরেলা আওয়াজ প্রাণভরে শুনলাম। সাড়ে তিন মাইল মেঠোপথ মাড়িয়ে গ্রামীণ বৈকালিক বাজার থেকে সদাইপাতি কিনে নিয়ে আসি। আমি আর ইয়াকুব। রান্না করে দেয় ইয়াকুবের খুরতোতো বোন। সারাদিন ঘুরে বেড়াই। খাইদাই।
ভালোই কাটছিল ফেরারি জীবন। আশপাশের সমবয়সী অনেকের সাথে ইতোমধ্যেই বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। পাশের বাড়ির শাহীন নামে একটা ছেলে বাউন্ডুলে টাইপের। ওর কাছে কমলাকান্দা বর্ডার, বাজার সিনেমা হলের গল্প শুনে একদিন সখ হলো কমলাকান্দা উপজেলা শহরে যাবো। অনেকদিন বনে=বাদাড়ে পাহাড়ে-জঙ্গলে থেকে হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। সীমান্তবর্তী পাহাড়ি শহরটাও ঘুরে দেখা যাবে, সেইসঙ্গে সিনেমাও। শাহীনকে সাথে নিয়ে খুব সকালে রওনা হলাম কমলাকান্দা উপজেলা শহরের উদ্দশ্যে। তখন শুস্ক মৌসুম। পাহাড়ি মেঠোপথ পেরিয়ে পৌঁছলাম পালপাড়া খেয়াঘাটের এপারে।
শুস্ক মৌসুম থাকায় নদীতে জল নেই। হেঁটেই পার হয়ে পালপাড়া ঘাটের বড় রাস্তায় উঠলাম। যাত্রীয় অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে সারিসারি রিকশা। রিকশা চেপে কমলাকান্দা বাজারে পৌঁছলাম। পুরো বাজার ঘুরে বেড়ালাম। সিনেমা দেখে শাহীনদের কমলাকান্দা বাজার সংলগ্ন বাড়িতে রাতে থাকলাম। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এদিক ওদিক ঘোরাঘুরির পর আনন্দপুর ফেরার তাগাদা দিলাম। শাহীনের কিছু কাজ আছে। সে আমাকে আরও একদিন থেকে যেতে বললো। আমি তো ইয়াকুবকে বলে আসিনি।
অচেনা জায়গা। নিশ্চয়ই আমার জন্য চিন্তা করছে। যোগাযোগ যে করবো সেই উপায় নেই। তখনও মোবাইলের যুগ আসেনি। আমি নাছোড়বান্দা। আমাকে আজ ফিরতেই হবে। শাহীন বারবার থেকে যাওয়ার অনুরোধের পর বললো, এখন বিকাল ৪টা বাজে, যেতে যেতে রাত হয়ে যাবে। পালপাড়া ঘাটে পৌঁছতেই সন্ধ্যা হয়ে যাবে। রাতে পাহাড়ি রাস্তায় পথ হারিয়ে ফেলবি। আমি ওর কথায় কর্ণপাত না করে জেদের সাথে বললাম, আমি যেতে পারবো। একরকম জোর করেই রওনা দিলাম। ভাড়া ঠিক করে পালপাড়া ঘাট পর্যন্ত রিকশায় তুলে দিয়ে বিদায় নিল শাহীন।
ইটের সলিং রাস্তায় রিকশা চেপে নৌকার মতো হেলেদুলে পালপাড়া ঘাটে পৌঁছলো সন্ধ্যায়। খেয়াঘাট পার হলাম। দিনের বেলায় গল্প করতে করতে দুই বন্ধু সহজেই এসেছি। শাহীনের চেনাপথে শর্টকাটে পাহাড়ি সাড়ে সাত মাইল রাস্তা পাড়ি দিয়েছিলাম, তখন বুঝতেই পারিনি। পাহাড়ি রাস্তা সম্পর্কে পূর্ব অভিজ্ঞতাও নেই। আমার ভেতর উদ্যমী সাহস কাজ করছে যেতেই হবে। রাস্তার মাঝে কী পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে সেদিকে খেয়াল একদমই নেই। রওনা দিলাম জোর কদমে।
কিছুদূর এগুনোর পর সন্ধ্যা পেরিয়ে অন্ধকার নেমে এলো। তখনো আবছা আলোয় মেঠোপথ দেখা যায়। অনেক দূরে পরপর বাড়ি। রাস্তার পাশে উঠোনে গোয়াল ঘরে কেউ গরু বাঁধছে, কেউ ঘরে কুপি-বাতি জ্বালিয়ে রাতের খাবার খাচ্ছে। আবার অনেকেই ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। অন্ধকার রাত। সুনসান নীরবতা। বাড়ির পাশে মেঠোপথে পায়ের শব্দ শুনে ঘর থেকে আওয়াজ করে হাঁক দিচ্ছে, কেলা যায়? কতক্ষণ পরপর উত্তর দিচ্ছি, আমি এই গাঁওয়ের মানুষ না, আমাকে চিনবেন না, আনন্দপুর যাচ্ছি। পরবর্তী উত্তর আসছে ওহ্ ভিনদেশি। এই ডাকাডাকির মধ্যে মাইল খানেক পথ চিনতে সুবিধাও পেয়েছি। জেনে নিয়েছি আনন্দপুরের পথ কোন দিকে? তারা বামে-ডানে বলে দিয়েছে।
মাইলের পর মাইল হেঁটে যাচ্ছি। গায়ে গরম কাপড় নেই। কনকনে শীত এসে গায়ে লাগছে। মাইল খানেক পথ শেষ হওয়ার পর লোকালয় শেষ। গহীন বন-জঙ্গল। কুয়াশার আবরণে ঢাকা। ঘুটঘুটে অন্ধকার। আকাশে চাঁদেরও দেখা নেই। মাটিতে পড়া চাঁদের আলো আমায় পথ দেখাতো। গাছের ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দিয়ে দেখাতো গন্তব্য। ভরা অমাবস্যায় চাঁদ বাড়ি চলে গেছে। আমায় পথ দেখাবার কেউ নেই। কেউই না। নিকষ কালো অন্ধকার মাথায় নিয়ে অচেনা পাহাড়ি পথে হাঁটা শুরু করলাম।
যেখানে নিজের ছায়াও দেখা যায় না, সেখানে অনুমান করে বন-বাদাড় পেরিয়ে পাহাড়ি মেঠোপথ পাড়ি দিতে হবে সাড়ে সাত মাইল। চারপাশে অন্ধকার। মাঝেমাঝে কুয়াশার কুণ্ডলি দেখে মনে হচ্ছে আশ্রিত মানুষ ওড়াউড়ি করছে। ঝিঁঝিঁ পোকার সুর আর শেয়ালের হুক্কাহুয়া ডাক-চিৎকার কানে ভেসে আসছে। বনে জঙ্গলে ঝোপঝাড়ে অন্যান্য প্রাণির আনাগোনায় ঝড়ে পড়া পাতার মরমর শব্দও পাচ্ছি। গা ছমছম করছে। ধুকপুক করছে হৃদপিণ্ড। ভয়ার্ত মনে কতক্ষণ পরপর দেশলাইয়ে কাঠি জ্বালাই। সিগারেট জ্বালিয়ে দুই আঙ্গুলের চিপায় ধরে রেখেছি। টান দেই না।
বাতাসে একটা সিগারেট পুড়ে ফুরিয়ে গেলে আরেকটা সিগারেট ধরাই। ঠাকুমা-ঠাকুরদার মুখে গল্প শুনেছি, আগুন থাকলে নাকি ভুত-প্রেত কাছে চাপে না। সেটাই কাজে লাগাচ্ছি। মন্ত্র-তন্ত্র যা মনে পড়ছে তাই বারবার পড়ছি। ভগবানের নাম নিয়েছি যে কতশত বার তা আর কিছু বলার নেই। মাঝেমাঝে গুনগুনিয়ে গানও গেয়েছি, যা পেয়েছি তাই। এমন অন্ধকার আমাকেই আমি দেখছি না, রাস্তা দেখা তো দূরের কথা। কখনো কখনো মেঠোপথ ছেড়ে বনজঙ্গল পেরিয়ে আধা কিলোমিটার অন্যদিকে চলে গেছি। যখন মনে হয় দিনের বেলা আসার সময় খাল-মাঠ তো পড়েনি দু'পায়ের মেঠোপথে। আবার পেছনে ফিরে এসে মেঠোপথ ধরি।
একে তো অন্ধকার রাত, তার ওপর দুটি বাঁশের সাঁকো পাড়ি দিতে হবে পথিমধ্যে। মহা মুসিবত! দুরুদুরু বুকে কাঁপাকাঁপা পায়ে প্রথম সাঁকো পাড়ি দিলাম। আধা মাইল হাঁটার পর দ্বিতীয় সাঁকো। এবার দ্বিতীয় সাঁকোতে উঠলাম। দূর্বাঘাসে শিশির মাড়িয়ে পথ হাঁটায় পায়ে থাকা চামড়ার সেন্ডেলের তলা ভিজে পিচ্ছিল। একবাঁশ নিচে আরেক বাঁশ ধরার জন্য উপরে বাঁধা। নিচে থাকা বাঁশটি আড়াআাড়ি বাঁশের ওপর আটকে আছে। একবাঁশের ওপর হেটে সাঁকো পাড়ি দিতে হবে। অন্ধকারে কিছু দেখাও যায় না। কয়েক পা এগুনোর পর সাঁকোর বাঁশ থেকে আমার পা ফসকে যায়। নিচু দিকে যেতে অচমকা সাঁকোর পাটাতনের বাঁশটি হাত দিয়ে ধরে ফেলি। মরণের ভয়ে কোথা থেকে যে শক্তি এসে পড়লো শরীরে! দুই হাতে বাঁশ ধরে ঝুলছি আর নিচে আড়াআড়ি বাঁশ।
হাত ফসকালেই চোখা বাঁশের ওপর পড়ে নির্ঘাত মৃত্যু। খুবই কষ্টে বাঁশের ওপর উঠলাম। বসে আস্তে আস্তে টানা দিয়ে ওপরের বাঁশটাও ধরলাম। ধীরে ধীরে সাঁকো পার হয়ে হাঁফ ছাড়লাম। কিছুক্ষণ হাঁটার পর লোকালয় দেখা গেলো। আরো মাইলখানেক বাড়িঘর বনজঙ্গল খোলা মাঠ পেরিয়ে আনন্দপুর বাজারে পৌঁছলাম রাত ২টায়। বাজারের দোকানপাট সব বন্ধ। বাজার পাহারা দিচ্ছে একজন নাইটগার্ড। কিছুক্ষণ পরপর হাঁক ছাড়ছে। আশপাশে ঘুরঘুর করছে দু'তিনটি কুকুর। এরাও রাতের বাজার পাহাড়াদার।
আমাকে অচেনা মানুষ পেয়ে তিনি বললেন, এত রাতে কোথা থেকে আসলেন? বাজারে কেন? সেইসঙ্গে নানা প্রশ্ন। পরে সব ঘটনা খুলে বললে তিনি সহৃদয় হয়ে বললেন, এতটা পথ হাইটা আইসুন, ক্ষিধাতো লাগছেই? বাজারে বেকারির দোকানের ভেতর রাতে কর্মচারীরা থাকে। তাদের ডেকে তুলে পাউরুটি কেনার ব্যবস্থা করে দিলেন। দৌড়ে টিউবওয়েল থেকে জল এনে দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন করালেন বৃদ্ধ নাইটগার্ড। সেখানে বসে পেটপুজো করে বাড়ির দিকে রওনা দিলাম। শেষ হলো অন্ধকার রাতে পাহাড়ি পথের ভয়ার্ত গল্প।

Post a Comment