এবার যাতায়াতের সুবিধার্থে আসছে উড়ন্ত গাড়ি - The News Lion

এবার যাতায়াতের সুবিধার্থে আসছে উড়ন্ত গাড়ি



দি নিউজ লায়নঃ   এবার আমাদের যাতায়াতের সুবিধার্থে আসছে উড়ন্ত গাড়ি। যা আগামী দশকগুলোতে আমাদের যাতায়াত, কর্মজীবন এবং জীবনযাত্রায় একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে চলেছে।  বিজ্ঞানের নানা ক্ষেত্রে এতটাই অগ্রগতি হয়েছে যে উদ্ভাবকরা এখন ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন ধরনের উড়ন্ত গাড়ি তৈরি করছেন। এছাড়া এসব গাড়ি আকাশে কোন পথ ধরে চলবে তার পথ নির্দেশনা পদ্ধতিও উদ্ভাবন করেছেন তারা।  এসব উড়ন্ত যান কেমন দেখতে হবে- এরকম কৌতুহল তো সবার মধ্যেই রয়েছে। এর আকার হবে বাণিজ্যিক বিমানের চেয়ে ছোট। আর বেশিরভাগই ডিজাইন করা হয়েছে ডানার বদলে হেলিকপ্টারের মত ঘূর্ণায়মান পাখা বা রোটার দিয়ে, যাতে গাড়িগুলো খাড়াভাবে আকাশে উঠতে বা নামতে পারে।  


সবচেয়ে বড় কথা হল এই উড়ন্ত গাড়িগুলোর নকশা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে দ্রুত এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়া যায়। বিশেষ করে যানজটের শহরগুলোতে মানুষ যাতে দ্রুত তার গন্তব্যে পৌঁছতে পারে।  তবে এই মুহূর্তে আকাশ যানের বাজার কতটা আশাব্যঞ্জক তা বলা মুশকিল। যদিও বেশ কয়েকটি নতুন গজানো প্রতিষ্ঠান পাল্লা দিয়ে বাণিজ্যিক আকাশ-যান, উড়ন্ত মোটরবাইক এবং ব্যক্তিগত উড়ন্ত ট্যাক্সি তৈরির কাজে নেমে পড়েছে। 


 উদ্যোক্তাদের অর্থ সহায়তা দানকারী বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান, পাশাপাশি গাড়ি ও বিমান সংস্থাগুলো এই সম্ভাবনাময় শিল্পে লগ্নি করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাদের ধারণা ২০৪০ সাল নাগাদ এটা ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের শিল্প হয়ে উঠতে পারে।  এমনকি উবার কোম্পানিও এই উড়ন্ত ট্যাক্সি সেবায় তাদের ভূমিকা কী হবে তা নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করে দিয়েছে। আকাশ পথে 'উবার এলিভেট' নাম দিয়ে তারা ব্যবসা করার ছক কাটছে।  


ইতোমধ্যে, বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ আকাশ পথে পরিবহন ব্যবস্থার নতুন নিয়মনীতি ও নিরাপত্তার মান কী হবে তার রূপরেখা তৈরির কাজও শুরু করেছে।  জার্মান ভিত্তিক কোম্পানি ভলোকপ্টার তাদের ভলোসিটি মডেলের বিদ্যুতশক্তি চালিত উড়ন্ত ট্যাক্সিকে প্রথম বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য লাইসেন্স দিয়েছে। সংস্থাটির পরিকল্পনা অনুযায়ী এই যান আগামীতে পাইলট বিহীন উড়তে পারবে।  শুরুর দিকে ভলোসিটির পাইলট চালিত উড়ন্ত ট্যাক্সিতে বসতে পারবেন মাত্র একজন যাত্রী। ফলে এই রাইডের জন্য ভাড়া পড়বে একটু বেশি।  


কিন্তু তারা আশা করছে যাত্রীদের মধ্যে আস্থা তৈরি হলে তারা স্বয়ং-চালিত মডেল বের করবে, যেখানে চালকের প্রয়োজন হবে না। এই যান চলবে বিদ্যুতশক্তিতে, গাড়ির কোন ডানা থাকবে না। নয়টি ব্যাটারি থেকে সরবরাহ করা বিদ্যুতশক্তি দিয়ে গাড়ি চলবে।  বিমান ওঠানামার জন্য যেমন বিমানবন্দর বা এয়ারপোর্ট থাকে, এইসব উড়ন্ত ট্যাক্সি ওঠানামার জন্য বড় বড় শহরের বিভিন্ন জায়গায় বসানো হবে ভার্টিপোর্ট। এই ট্যাক্সি যেহেতু খাড়াভাবে (ভার্টিকালি) আকাশে উঠবে, তাই এই ওঠানামার বন্দরগুলোর নাম তারা দিতে চাইছেন ভার্টিপোর্ট।


  ভলোসিটি বাণিজ্যিকভাবে তাদের উড়ান শুরু করবে ২০২২ সালে।  প্রাথমিক পর্যায়ে একটা উড়ানে একটা টিকেটের দাম পড়বে ৩৫০ ডলার (২৭০ পাউন্ড)।  বড় বড় গাড়ি নির্মাতা এবং বিমান চলাচল শিল্প ইতোমধ্যেই উড়ন্ত গাড়ির বাজারে চাহিদার বিষয়টি খতিয়ে দেখেছে। জাপানের স্কাই ড্রাইভ কোম্পানির তৈরি এসডি-০৩ উড়ন্ত গাড়ি এবছর অগাস্টে জাপানের আকাশে পরীক্ষামূলকভাবে ওড়ানো হয়েছে।  ব্রিটেন ভিত্তিক এয়ারোনটিকাল কোম্পানি গ্র্যাভিটি ইন্ডাস্ট্রিস বলছে আকাশে ওড়ার অনেক প্রযুক্তি আছে যেগুলোর ব্যবহার এখনও সীমিত। যেমন তাদের তৈরি উচ্চ হর্সপাওয়ারের ‘জেটপ্যাক’। যেটি গায়ে পরে মানুষ আকাশে উড়তে পারে।  প্রতিষ্ঠানটি বলছে এটা অনেকটা রেসিং কারের মত। এই যন্ত্র গায়ে বেঁধে নিয়ে এতে সঞ্চিত গ্যাস বা জ্বালানি শক্তি দিয়ে বাতাস কেটে মানুষ দ্রুত উড়ে যেতে পারবে গন্তব্যে।  


ব্রিটেনের কোম্পানি গ্র্যাভিটি ইন্ডাস্ট্রিস একটি জেটপ্যাক তৈরি করেছে যা গায়ে বেঁধে আকাশে ওড়া যায়। প্রতিষ্ঠানটি দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সন্ধান ও উদ্ধারের কাজে এই প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক ব্যবহার করেছে।  তবে এ ধরনের আকাশ যানে যখন মানুষ চলাচল করবে তখন সেক্ষেত্রে আকাশের সড়কে তা নিরাপদ কিনা সেটা নিশ্চিত করতে হবে। ওই যানের আকাশ পথে চলাচল ও ওঠানামার জন্য বৈধ লাইসেন্স আছে কিনা, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে। মানুষের আস্থা থাকতে হবে এই নতুন পরিবহন ব্যবস্থার ওপর।  আকাশে যখন অনেক গাড়ি চলাচল শুরু হবে তখন ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থারও প্রয়োজন হবে। 


উদ্ভাবকরা বলছেন আকাশে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা হতে হবে স্বয়ংক্রিয়- ইউটিএম বা আনম্যান্ড ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট।  এর জন্য পুরো স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার বিকল্প নেই। নতুন চ্যালেঞ্জ থাকবে অনেক। শুধু তো আকাশে চলা গাড়ি বা অন্য ধরনের যানবাহন নয়, আকাশে আরো অনেক ধরনের ঝুঁকি থাকবে যেমন উড়ন্ত মহাজাগতিক বস্তু, পাখি, ড্রোন, আর বিমান! এদের কেউ চলার পথে এসে পড়ছে কিনা তা নিয়ন্ত্রণ জরুরি হবে।  ফলে তৈরি করতে হবে নিরাপদে চলাচলের পথ, ওঠানামার জন্য আকাশে নিরাপদ করিডোর, এমনকি প্রয়োজনে আকাশে যান পার্কিং করে রাখার ব্যবস্থা।  আর সেজন্যই আকাশের মহাসড়ক নিরাপদ ঝুঁকিমুক্ত করতে আকাশপথে চলাচলের নিয়মবিধি ও নতুন আইন তৈরি আবশ্যক হবে।  


গাড়ি নির্মাতা এবং আকাশ পরিবহনের পরিচালকদের আশ্বাস দিতে হবে যে এই নতুন যান চলাচল ব্যবস্থা আকাশ যাত্রী এবং নিচে মাটিতে যারা চলাচল করছেন তাদের জন্যও সমানভাবে নিরাপদ।  খারাপ বা দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া, পাখির সাথে ধাক্কার ঝুঁকি, হঠাৎ চলার পথে জেটপ্যাক বেঁধে উড়ে যাওয়া মানুষ এসে পড়া এসব নানাধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে উদ্ভাবনকারীরা তৈরি করছেন নির্দেশাবলী।  


গাড়ির জরুরিকালীন নিগর্মন দরজা এবং নিগর্মন ব্যবস্থা, বজ্র বিদ্যুতের সময় সুরক্ষা ব্যবস্থা, আকাশে গাড়ির ভেতর নিশ্বাস নেবার জন্য কেবিনের যথাযথ চাপ নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি অনেক খুঁটিনাটি বিষয়েও দেয়া হচ্ছে নজর।  কিন্তু একটা বিষয়ে সব বিশেষজ্ঞই একমত যে নিউ ইয়র্ক, বেইজিং, হংকংএর মত বড় শহরগুলোয় গাড়ির সংখ্যা যেভাবে বেড়েছে, এবং তার ফলে যে ধরনের যানজট তৈরি হচ্ছে তাতে এসব দেশের জন্য তাদের ব্যবসা ও অর্থনীতি সচল রাখতে আকাশেও সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তোলার কোন বিকল্প আগামীতে নেই।  


তবে আকাশে যান চলাচল ব্যবস্থা তৈরি করতে হলে শহরের কাঠামোও পুনর্বিন্যাস করতে হবে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন। এখন শহরে অনেক উঁচু উঁচু বাড়ি তৈরি হচ্ছে। শহরের উঁচু ভবনগুলো ভবিষ্যতে এমনভাবে তৈরির কথা নগর স্থপতিদের ভাবতে হবে যেখানে উড়ন্ত গাড়ি বা আকাশ যান ওঠানামার জন্য ল্যান্ডিং প্যাড তৈরির সুযোগ থাকবে। মাটিতে চাপ কমানোর জন্য উঁচু বাড়িগুলোকে যুক্ত করার জন্য আকাশ পথ তৈরির কথাও ভবিষ্যতে নগর পরিকল্পনাবিদদের বিবেচনায় নিতে হবে।  


তারা বলছেন, মাটিতে গাড়ি ও রাস্তার চাপ কমানো গেলে আরও সবুজ জায়গা, পার্ক, মাঠ তৈরি করে শহরকে আরও পরিবেশ বান্ধব করার সুযোগ সৃষ্টি হবে।  হয়ত ২০৪০ পরবর্তী বিশ্বে মাটিতে চলাফেরার পাশাপাশি, আকাশে চলাফেরার নতুন একটি দুনিয়া তৈরি হবে। 

কোন মন্তব্য নেই

Thankyou To Comment us

Blogger দ্বারা পরিচালিত.