জয়পুর রাজবাড়ির ঠাকুরদালানে এবার পূজিত হবেন না সোনার দুর্গা
দি নিউজ লায়ন ; বছরে ৩৬০ দিন বন্দি থাকেন ব্যাঙ্কের লকারে। পুলিশ প্রহরায় পুজোর পাঁচ দিন ঠাকুর দালানে আসতেন মা। কিন্তু এই বছর এক দিনের জন্যেও ঠাকুর দালানে আসছেন না সোনার দুর্গা মা। করোনার জেরে এবার সোনার দুর্গাকে ছাড়াই পুজো হবে পুরুলিয়ার জয়পুরের রাজবাড়িতে। শুধু মাত্র তরবারি বা খড়্গ দিয়ে পুজো করবেন রাজপরিবারের সদস্যরা।
রাজবাড়ির ঠাকুর দালানে রঙের প্রলেপ পড়লেও মা না আসায় মন ভালো নেই রাজপরিবারের সদস্যদের। পুরুলিয়ার জয়পুরের রাজপরিবারের সদস্য শঙ্কর নারায়ন সিং দেও বলেন, ব্যাঙ্কের লকার থেকে পুজোর পাঁচ দিন মা আসেন রাজবাড়ির ঠাকুর দালানে। বছরের ৩৬০ দিন লকারেই থাকেন। এই বছর করোনার জন্য সেই রীতির ছেদ পড়ে গেল।”
জয়পুর রাজ পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছে, ঔরঙ্গজেবের ভয়ে ১৬৬৮ খিস্ট্রাব্দে মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়ীনি থেকে সৈনদের নিয়ে ৩৫২ বছর আগে এই এলাকায় পা রাখেন রাজা জয়সিংহ স্বপারিষদ। সেই সময়কালে কোল, ভিল, মুন্ডাদের রাজত্ব ছিল এই এলাকায়। মুন্ডাদের অধিপত্ব ছিনিয়ে নিতে খামার মুন্ডার কাছে তার তরবারি ছিনিয়ে তাকে হত্যা করে এলাকা দখল এবং রাজত্ব স্থাপন করেন রাজা জয় সিংহ। এই এলাকার নাম হয় জয়পুর। এলাকার সেই নাম আসে রাজা জয় সিংহের নামানুসারেই।
তরবারিকে সামনেই রেখেই ১৬৭০ সালে শক্তির প্রতিক হিসাবে মা দুর্গার আরাধনা করেন রাজা জয় সিংহ। ওই তরবারি দিয়ে ১৬৭০ সাল থেকে ১৮৩৫ সাল পর্যন্ত মা দুর্গার পুজা করেন রাজা। কিন্তু ১৮৬৬ সালে ঘটে যায় এক অঘটন। সেই সময় জয়পুরের রাজা ছিলেন মদন মোহনের ছেলে অষ্টম রাজা কাশীনাথ সিং। পুজোর সময় ঠাকুর দালানে থাকা জাগর প্রদীপ উল্টে ঘটে যায় অগ্নিকান্ড।
মন্দির ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে পুড়ে যায় মায়ের মূর্তিও। রাজ পরিবারের অমঙ্গলের কথা মাথা রেখেই মায়ের স্বপ্নাদেশ পেয়ে সোনার মুর্তি তৈরি করার নির্দেশ দেন রাজা কাশী নাথ সিং। সোনার দুর্গা গড়তে স্বর্নকারদের ডাক পড়ে রাজবাড়ীতে। বেনারসের কনকদুর্গা আদলে সোনা দিয়ে তৈরি করা হয় মা উমাকে। ১০৮ টি আকবরি স্বর্নমুদ্রা, বেনারসের মণিমুক্তো হিরে-জহরত দিয়ে সাড়ে এগারো গ্রাম স্বর্নমুদ্রা মিলিয়ে দেড় কেজি ওজনের দু ফুট উচ্চতার গড়া হয় মাকে। এখন ভারতীয় মুদ্রায় যার দাম কোটি টাকারও বেশি।
১৮৬৭ সাল থেকে সোনার তৈরি দুর্গা মুর্তি পূজো হয়ে আসছে জয়পুরের রাজবাড়ীর ঠাকুর দালানে। সোনায় গড়া দুর্গা প্রতিমা লুঠ করতে ১৯৬৯ সালে এই রাজবাড়ীতে হানা দেয় ডাকাতের দল। লুঠ করে নিয়ে যায় রাধিকা মুর্তি সহ সোনার নানান অলঙ্কার। কিন্তু সোনার তৈরি দুর্গা লুঠ করে ব্যর্থ হয় ডাকাতের দল। সেই থেকে সোনার দুর্গার ঠাই হয় ব্যাঙ্কের লকারে। লকারেই ঠাই হয় মায়ের অলঙ্কারও।
সেই থেকে লকার থেকে মাত্র পাচ দিনের জন্য পুলিশ এসকট-এ ঠাকুর দালানে আসেন সোনার মা দুর্গা। পাচ দিন ধরেই সোনায় মোড়া মাকে দেখতে কয়েক হাজার মানুষের ভিড় পড়ে যায় জয়পুরের ঠাকুর দালানে। এই বার সাধারন মানুষ যাতে না ভিড় করেন ঠাকুর দালানে সেই কারনেই মা কে না আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন রাজপরিবারের সদস্যরা।
শঙ্কর নারায়ন সিং বাবু বলেন, করোনার কথায় মাথায় রেখেই মাকে না আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই ঠাকুর দালানে দেড়শো বছরের বেশি মাকে ছাড়া পুজো হয়নি। কঠিন সিদ্ধানন্ত নেওয়া হয়েছে এই বছর। তাই এই বছর মা না নিয়ে আসায় মন ভালো নেই রাজপরিবারে কারোর।

Post a Comment