আল্লামা আহমদ শফীর আদ্যোপান্ত
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি, বাংলাদেশ ; হেফাজত আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফি আর বেঁচে নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় তিনি রাজধানীর আজগর আলী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন।
হেফাজতে ইসলামের আমীর ও চট্টগ্রামের হাটহাজারী দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম মাদ্রাসার সদ্যবিদয়ী মহাপরিচালক আল্লামা শাহ আহমদ শফির মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ১০৪ বছর। বেশ কিছুদিন ধরেই তিনি বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন।তাঁর দুই ছেলের মধ্যে আনাস মাদানি হেফাজতে ইসলামের প্রচার সম্পাদক। অন্যজন মাওলানা মোহাম্মদ ইউসুফ পাখিয়ারটিলা কওমি মাদ্রাসার পরিচালক।
আল্লামা শফীর শিক্ষাজীবন শুরু হয় রাঙ্গুনিয়ার সরফভাটা মাদ্রাসায়। এরপর পটিয়ার আল জামিয়াতুল আরাবিয়া মাদ্রাসায় (জিরি মাদ্রাসা) লেখাপড়া করেন। ১৯৪০ সালে তিনি হাটহাজারীর দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসায় ভর্তি হন। ১৯৫০ সালে তিনি ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসায় যান, সেখানে চার বছর লেখাপড়া করেন।
১৯৮৬ সালে হাটহাজারী মাদ্রাসার মহাপরিচালক পদে যোগ দেন আহমদ শফী। এরপর থেকে টানা ৩৪ বছর ধরে তিনি ওই পদে ছিলেন। দেশের আলেমদের কাছে শ্রদ্ধার পাত্র আহমদ শফী বাংলায় ১৩টি এবং উদুর্তে নয়টি বইয়ের রচয়িতা।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে ২০১৩ সালে গণজাগরণ আন্দোলন শুরুর পর তার বিরোধিতায় হেফাজতে ইসলামকে নিয়ে মাঠে নেমে আলোচনায় উঠে আসেন আহমদ শফি। এর আগে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মুখে হাটহাজারী বড় মাদ্রাসার মহাপরিচালকের পদ ছাড়েন শাহ আহমদ শফী।
এই মাদ্রাসার মহাপরিচালক হিসেবে দেশের কওমি মাদ্রাসাগুলোর নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন আহমদ শফী, যাদের কাছে তিনি ‘বড় হুজুর’ নামে পরিচিত। তিনি বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা বোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশেরও (বেফাক) সভাপতি পদেও ছিলেন। এ ছাড়া হেফাজতে ইসলাম নামে সংগঠনের আমীরের দায়িত্বও পালন করছেন তিনি।
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া থানাধীন পাখিয়ারটিলা নামক গ্রামের ঐতিহ্যবাহী আলেম পরিবারে আল্লামা শফি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি মোঃ বরকত আলী ও মেহেরুন্নেছা বেগমের পুত্র বলে জানা যায়।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে হাটহাজারী মাদ্রাসায় অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আজ শুক্রবার তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি দেখা গেলে এয়ার এ্যাম্বুলেন্স যোগে রাজধানীর আজগর আলী হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এ বর্ষীয়ান ইসলামী নেতাকে।
আজ শুক্রবার ১৮ই সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় উনার মৃত্যু হয় বলে ড্যাবের সাবেক মহাসচিব ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন নিশ্চিত করেন।
এ ছাড়া দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা মোজাম্মেল হকও উনার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
আল্লামা আহমদ শফির নিয়মিত শিক্ষাজীবন শেষ হয়েছিল ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দে শিক্ষাগ্রহণের মাধ্যমে। সেখান থেকেই তিনি মাওলানা সনদ লাভ করেন। দেওবন্দে অধ্যয়নরত অবস্থায় আহমদ শফী শায়খুল ইসলাম হজরত হোসাইন আহমদ মাদানির হাতে বায়াত গ্রহণ করেন। তিনি উপমহাদেশে খ্যাতিমান ইসলামি আইন বিশারদ মুফতি ফয়জুল্লাহ, শায়খুল হাদিস আল্লামা সুফি আবদুল কাইউম, শায়খুল আদিব আল্লামা মুহাম্মদ আলী নিজামপুরী ও শায়খ আল্লামা আবুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহি প্রমুখের কাছে বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা অর্জন করেন।
অত্যন্ত নম্র, ভদ্র, বিনয়ী, চিন্তাশীল, মেধাবী ছিলেন বলে আল্লামা আহমদ শফি তাঁর উস্তাদদের বিশেষ নজরে থেকে শিক্ষাজীবন কৃতিত্বের সঙ্গে শেষ করেছিলেন।
শীর্ষ এই আলেমের নামাজে জানাজা আগামীকাল শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) বাদ যোহর দুপুর ২ টায় অনুষ্ঠিত হবে। জানাজায় ইমামতি করবেন মরহুমের সন্তান মাওলানা আনাস মাদানী।
শুক্রবার রাত নয়টায় এ সিদ্ধান্তের বিষয়ে জানিয়েছে হাটহাজারী মাদরাসার শুরা কমিটি। আজ রাতেই ঢাকা থেকে মরহুমের মরদেহ চট্টগ্রামে নিয়ে আসা হবে।
বর্তমানে হাসপাতাল থেকে তাঁর মরদেহ ঢাকার ফরিদাবাদ মাদরাসায় গোছল-কাফনের জন্য নেয়া হয়েছে। রাতেই মরদেহ হাটহাজারী মাদরাসায় নিয়ে আসা হবে।
পরে শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) ফজর নামাজের পর থেকে জোহর নামায পর্যন্ত হাটহাজারী মাদরাসার কনযুদ্দাকায়েক শ্রেণী কক্ষে মরহুমের মরদেহ সকলে শেষবার দেখার জন্য রাখা হবে।
জানাযা শেষে মাদরাসা ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে বায়তুল আতিক জামে মসজিদ সম্মুখস্থ কবরস্থানে দাফন করা হবে।

Post a Comment