এক হতভাগ্য বিপ্লবী, দেশকে স্বাধীন করে যেতে হয় পাকিস্তানে
এক হতভাগ্য বিপ্লবী, দেশকে স্বাধীন করে যেতে হয় পাকিস্তানেব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ বিপ্লবী মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী। দেশ ও মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে কাজ করার জন্য চিরকুমার ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী ছিলেন কখনো যোদ্ধা, কখনো গুপ্তচর। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন করে ৩০ বছর জেলখানায় জীবন অতিবাহিত করেছিলেন ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী। বৃটিশ সরকারের দায়ের করা একের পর এক মামলায় তাঁকে কারাভোগ করতে হয় দফায় দফায়। কখনো হত্যা মামলা, বরিশাল ষড়যন্ত্র মামলা, ঢাকা ষড়যন্ত্র মামলা, রাজাবাজার বোমা হামলা এভাবে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩০ বছর কারাগারেই কাটে। এসেছিল জয়। বিশ্ব জেনেছিল লড়াইয়ের এক অদম্য হার না মানা ভারতের ম্যান্ডেলাকে।
কিন্তু কোথাও গোপনে হারিয়ে যান ভারতের ম্যান্ডেলা। তিনি ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী। দেশের স্বাধীনতার জন্য তিনি ৩০ বছর জেলে কাটিয়েছিলেন। তারপরের ঘটনা আরও করুন। যে দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়লেন সে দেশেই আর থাকা হয়ে ওঠেনি। দেশ ভাগ হয়। ভারতের মাদিবাকে চলে যেতে হয় পূর্ব পাকিস্তান বর্তমান বাংলাদেশে। ‘তাঁর লেখা বই থেকেই জানা যায় ৩০ বছরের জেল জীবন ও স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর লড়াইয়ের ঘটনাগুলি। ১৯৬৭ সালে তাঁর লিখিত গ্রন্থ ‘জেলে তিরিশ বছর ও পাক-ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম’ প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি এ বইয়ের ভূমিকায় লিখেছিলেন, ‘পৃথিবীতে সম্ভবত আমিই রাজনৈতিক আন্দোলন করার কারণে সর্বাধিক সময় জেলখানায় অতিবাহিত করেছি। মাঝখানে দু-এক মাস বিরতি ছাড়া ১৯০৮ সন হইতে ১৯৪৬ সন পর্যন্ত ৩০ বৎসর কারাগারে কাটাইয়াছি, ৪/৫ বৎসর অজ্ঞাতবাসে কাটাইয়াছি। …জেলখানার পেনাল কোডে যেসব শাস্তির কথা লেখা আছে এবং যেসব শাস্তির কথা লেখা নাই তাহার প্রায় সব সাজাই ভোগ করিয়াছি।’
ম্যাট্রিক পরীক্ষার ২ মাস আগে ১৯০৮ সালে তিনি বিপ্লবী দলের কাজে অবিভক্ত ভারতের নারায়নগঞ্জে আসেন। এসময় ব্রিটিশ পুলিশ বিপ্লবাত্মক কাজের জন্য তাঁকে গ্রেফতার করে ৬ মাসের জেল দেয়। ওখানেই তাঁর প্রথাগত শিক্ষার সমাপ্তি ঘটে। শুরু হয় এক নতুন জীবন। সে সময় তিনি ছয় মাস কারাভোগ করেন। মুক্তি পেয়ে ১৯০৯ সালে তিনি ঢাকায় আসেন। ঢাকায় আসার পর তাঁকে টাকা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত করা হয়। শুরু হয় তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারী অভিযান। এ মামলায় তিনি ছিলেন অন্যতম আসামী। পুলিশ হন্যে হয়ে তাঁর সন্ধান শুরু করে। তিনি ঢাকার বিপ্লবীদের সাথে পরামর্শ করে আত্মগোপনে চলে যান। আত্মগোপন অবস্থায় তিনি আগরতলার উদয়পুর পাহাড় অঞ্চলে চলে যান। সেখানে গিয়ে তিনি বিপ্লববাদী দলের একটি শাখা স্থাপন করেন। দুই বছরের মধ্যে তিনি উদয়পুর পাহাড় অঞ্চলে বিপ্লবীদের একটি বিশাল ঘাঁটি তৈরি করেন। এই অঞ্চলের বিপ্লবী দলের তিনি সম্পাদক ছিলেন।
তাঁর কাজ ছিল শরীর চর্চা, ব্যায়াম, লাঠি খেলা, ছোড়া খেলা, কুস্তি ইত্যাদির আড়ালে রাজনৈতিক শিক্ষা, বিপ্লবাত্মক প্রচার ও বিপ্লবী কর্মী তৈরী করা। উদ্দেশ্য ভারতমাতাকে ব্রিটিশসাম্রাজ্যের হাত থেকে মুক্ত করা। ১৯১২ সালে ওখান থেকে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। এসময় তাঁর বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। প্রমাণের অভাবে বৃটিশ পুলিশ এই হত্যা মামলা থেকে তাঁকে অব্যাহতি দিতে বাধ্য হয়। এরপর তিনি স্থান পরিবর্তন করে মালদহ যান। সেখানে তিনি বিপ্লবী দল গড়ে তোলার জন্য কাজ করেন। এখানে এই দলের একটি শক্তিশালী শাখা গঠন করার পর ১৯১৩-১৯১৪ সালে তিনি রাজশাহী ও কুমিল্লায় গুপ্ত বিপ্লবী দলের ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা করেন।
এই গুপ্ত সমিতি বা বিপ্লবী দল প্রতিষ্ঠা করতে তাঁকে দলের সিনিয়ররা সহযোগিতা করতেন। বিপ্লবী সতীশ পাকড়াশী ছিলেন তাঁর স্কুল জীবনের সহপাঠী। তাঁদের স্কুলের প্রায় অর্ধেক ছাত্র অনুশীলন সমিতির সভ্য ছিলেন। সহপাঠী ত্রৈলক্য চক্রবর্তীর সংস্পর্শে এসে সতীশ পাকড়াশী এই সমিতির সভ্য হন। ১৯১৪ সালে ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীকে আবারও ব্রিটিশ পুলিশ গ্র্রেফতার করে। গ্র্রেফতারের পর এসময় তাঁকে বরিশাল ষড়যন্ত্র মামলার আসামি করা হয়। এই মামলার মাধ্যমে তাঁকে দশ বছরের কারাদণ্ড দিয়ে আন্দামানে প্রেরণ করা হয়। শুরু হয় মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ। ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী ভারত উপমহাদেশের মানুষকে শাসন করার জন্য শুরু থেকেই নানারকমের দমননীতির আশ্রয় নেয়।
এর মধ্যে জেলখানাগুলো ছিল তাঁদের এই দমননীতির প্রধান হাতিয়ার। আর আন্দামান সেলুলার জেল ছিল সবচেয়ে ভয়ংকার জেল। ১৯২৪ সালে আন্দামান সেলুলার জেল থেকে মুক্তি পান ত্রৈলোক্যনাথ। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের পরামর্শে তিনি দক্ষিণ কলকাতার জাতীয় স্কুলের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই জাতীয় স্কুলের শিক্ষার্থীদেরকে রাজনৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতেন তিনি। একই সাথে বিপ্লবী দলের নেতা ও সংগঠক হিসেবে ভারতের বিভিন্ন এলাকায় বিপ্লবী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। মাত্র তিন বছর যেতে না যেতে ১৯২৭ সালে তাঁকে আবারও ব্রিটিশ পুলিশ গ্রেফতার করে। এ সময় তাঁকে ব্রহ্মদেশের মন্দালয় জেলে পাঠানো হয়। এখানে তিনি নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, পৃথি শিং, পুলিন বাবু, এম.পি নারায়ণ মেনন, গুরুমূখ শিং, পন্ডিত পরমানন্দ, মোস্তফা আমেদসহ আরো অনেক সহযোদ্ধার সাথে কারাবাস করেন। ১৯২৮ সালে তাঁকে ভারতে এনে নোয়াখালি জেলার হাতিয়া দ্বীপে নজরবন্দী করে রাখা হয়।
ওই বছর মুক্তি পেয়ে তিনি উত্তর ভারতে যান এবং হিন্দুস্তান রিপাবলিকান আর্মিতে যোগ দেন। এরপর ভারতীয় বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য বিপ্লবী দল তাঁকে ব্রহ্মদেশে পাঠায়। তিনি বিপ্লবী ভাবধারায় বিশ্বাসী হলেও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসেও কাজ করতেন। ১৯২৯ সালে তিনি লাহোর কংগ্রেসে যোগদান করেন। এসময় বিপ্লববাদী সশস্ত্র দলকে সংগঠিত করার জন্য কংগ্রেসের রাজনীতিতে সরাসরি যুক্ত হয়ে কাজ শুরু করেন। রাজশাহীতে থাকাকালীন ১৯৩০ সালে তাঁকে আবারও ব্রিটিশ পুলিশ গ্রেফতার করে। এসময় তাঁকে একটানা ৮ বছর কারাবাস করতে হয়। এবার তাঁকে বিভিন্ন জেল ঘুরিয়ে কুখ্যাত বকসার বন্দিশালায় রাখা হয়।
ভুটান সীমান্তে সিঞ্চুলা পাহাড়ের কোল ঘেঁষে স্থাপিত হয়েছিল এ বন্দিশালা। এ জেলে এক সময় রাজবন্দিদের বছরের পর বছর কয়েদ করে রাখা হতো। ১৯৩৮ সালে তিনি মুক্তি লাভ করেন। ওই বছর তিনি সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ করে রামগড় কংগ্রেসের কাজে যুক্ত হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি ভারতীয় সৈন্যদের মধ্যে সশস্ত্র বিদ্রোহ ঘটানোর চেষ্টা করেন। ১৯৪২ সালে তিনি ‘ভারত-ছাড়’ আন্দোলনে যোগ দিয়ে গ্রেফতার হন। ১৯৪৬ সালে মুক্তি পেয়ে নোয়াখালীতে সংগঠন গড়ার চেষ্টা করেন। ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের পর তিনি পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন।
Post a Comment