বিপদসীমার ওপর দিয়ে বইছে ৫ নদীর জল - The News Lion

বিপদসীমার ওপর দিয়ে বইছে ৫ নদীর জল





ঢাকা প্রতিনিধি : বাংলাদেশের প্রধান নদ-নদীর জল  বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এরই মধ্যে ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলা, সুরমা, যাদুকাটা ও যমুনার জল   অতিক্রম করেছে বিপদসীমা। এর ফলে ওইসব নদী তীরবর্তী এলাকায় বন্যা শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এ বন্যা আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে দেশের ১৮ জেলায় বিস্তৃত হতে পারে। আর এ বন্যা দুই সপ্তাহ স্থায়ী হওয়ার আশঙ্কার কথা জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।





জানা গিয়েছে, কুড়িগ্রাম জেলার ১৬টি নদ-নদীর জল   বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। নীলফামারীতে তিস্তার জল   বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। গত ৪৮ ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিপাত এবং ভারতের মেঘালয় ও চেরাপুঞ্জিতে গত ৭২ ঘণ্টায় অস্বাভাবিক বৃষ্টি হওয়ায় সুনামগঞ্জে নদী তীরবর্তী এলাকা ও নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও কয়েকদিনের প্রবল বর্ষণে গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার তিস্তামুখঘাট পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রের জল   বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জামালপুরে যমুনার জল  বিপদসীমার ২১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।




বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া জানান, ব্রহ্মপুত্রের জল   কুড়িগ্রাম দিয়ে, তিস্তার জল   লালমনিরহাটে, পদ্মার জল   মুন্সীগঞ্জে ও হাওরের জল   সুনামগঞ্জ দিয়ে বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে। এভাবে বন্যা শুরু হতে পারে। এর পর নিচের দিকের জেলাগুলোয় পর্যায়ক্রমে বন্যা হতে পারে।




বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র সূত্রে জানা গিয়েছে, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, বগুড়া, দিনাজপুর, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, ফরিদপুর, রাজবাড়ী ও সুনামগঞ্জে বন্যা হতে পারে। তবে সব জেলায় টানা দুই সপ্তাহ ধরে বন্যা হবে, তেমনটা নয়। কোনো না কোনো জেলায় এ সময়ে বন্যার জল   থাকতে পারে। এর মধ্যে পদ্মার জলের  তোড় বা স্রোত বেশি থাকতে পারে। এতে মাদারীপুর, শরীয়তপুর, ফরিদপুর ও মুন্সীগঞ্জে বন্যার সঙ্গে নদীভাঙনও বাড়তে পারে।




কুড়িগ্রাম : জেলার ১৬টি নদ-নদীর জল  বৃদ্ধি পেয়ে তলিয়ে গেছে ৪৫০টি চর ও দীপচর। এর ফলে সবজি ক্ষেত তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকরা চিন্তায় পড়েছে। ইতোমধ্যে জলবন্দি হয়ে পড়েছে কুড়িগ্রাম জেলার নিম্নাঞ্চলের হাজারো মানুষ।


পাউবো এসডি মাহমুদ হাসান জানান, কুড়িগ্রামে ধরলা নদীর জল   সদর পয়েন্টে ৪৩ সেন্টিমিটার ও ব্রহ্মপুত্র নদের জল   চিলমারী পয়েন্টে বিপদসীমার ৩৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তিস্তা নদীর কাউনিয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ২৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, ব্রহ্মপুত্র নদের নুনখাওয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ২৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।


নীলফামারী : তিস্তার জল  বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। নীলফামারীতে গত ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে নদী অববাহিকার জনপদসহ চরের অসংখ্য ঘরবাড়ি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নদীতীরবর্তী এলাকার বীজতলা।


গাইবান্ধা : জেলা জল উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, শনিবার তিনটা পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র নদীর জল   গত ২৪ ঘণ্টায় তিস্তামুখঘাট পয়েন্টে ৫৯ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ২৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ জল   বৃদ্ধি আগামী চার দিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। ফলে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি, সাঘাটা ও সদর উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।


গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের সৈয়দপুর-বালাসীঘাটের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধটি গত বছর বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পানি উন্নয়ন বোর্ড তা মেরামতের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ফলে ব্রহ্মপুত্র নদীর জল   বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গেই বাঁধভাঙা এলাকা দিয়ে জল   ঢুকে সাঁতারকান্দির চর ও ভাষারপাড়া এলাকা আকস্মিক বন্যায় নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। ফলে ওই দুটি গ্রামসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার প্রায় দুই হাজার ৫০০ পরিবার জলবন্দি হয়ে পড়ে। এছাড়া গাইবান্ধা বালাসীঘাট সড়কের বাঁধের পূর্ব অংশের সড়কটি জলে তলিয়ে গেছে।



এদিকে সাঘাটা, ফুলছড়ি, গাইবান্ধা সদর, সুন্দরগঞ্জের নদীবেষ্টিত চরগুলোর নিম্নাঞ্চল ইতিমধ্যে  তলিয়ে গেছে। ফলে এসব এলাকার বসতবাড়ির লোকজন জলবন্দি হয়ে পড়েছে। সেই সঙ্গে পাট, পটোল, কাঁচামরিচ ও শাকসবজির ক্ষেতসহ সদ্য রোপণকৃত বীজতলা তলিয়ে গেছে।


সুনামগঞ্জ : সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বশীলরা জানিয়েছেন, জেলার নদ-নদীর জল  শনিবার বিকালে এ বছরের সর্বোচ্চ ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। গতকাল বিকাল তিনটায় সুনামগঞ্জ শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সুরমা নদীর জল  বিপদসীমার ৬৬ সেন্টিমিটার এবং পাহাড়ি নদী যাদুকাটার জল  বিপদসীমার ১৬৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।



সুনামগঞ্জ জল উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সবিবুর রহমান জানান, ভারতের মেঘালয়-চেরাপুঞ্জিতে গত ৭২ ঘণ্টায় ৯০২ মিলি মিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। যা এ মৌসুমের সর্বোচ্চ। গত ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জে ১৯০ মিলিমিটার বৃষ্টি এবং এর আগের ৭২ ঘণ্টায় ২৯৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। এ কারণে সুরমা নদীর জল   বিপদসীমা ৭ দশমিক ৮ অতিক্রম করে ৮ দশমিক ৪৬ সেন্টিমিটার এবং পাহাড়ি নদী যাদুকাটার জল  বিপদসীমা ৮ দশমিক ৫ অতিক্রম করে ৯ দশমিক ৭১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বাংলাদেশ ও ভারতে আরও দুদিন বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকার শঙ্কা রয়েছে বলে জানান তিনি।



জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুল আহাদ বলেন, ‘সুনামগঞ্জ অঞ্চলে টানা বৃষ্টিপাত ও ভারতের চেরাপুঞ্জিতে অধিক বৃষ্টিপাত হওয়ায় ওপরের জল   নেমে এসে জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে। পরিস্থিতি মনিটরিং করতে জেলা সদরসহ প্রতিটি উপজেলায় বিশেষ কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের নগদ টাকা ও চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’



ইসলামপুর : অতিবর্ষণে ও উজানের ঢলে যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। ফলে জামালপুরের ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ ও মেলান্দহ উপজেলার নিম্নাঅঞ্চলের শতাধিক মানুষ জলবন্দি হয়ে পড়েছেন। এ ছাড়া চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার পাট, কাউন, চিনাবাদামসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষেতে জল উঠেছে।



জামালপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবু সাইদ শনিবার দুপুরে জানান, যমুনার জল   বিপদসীমার ২১ সেন্টিমিটার ওপর এবং ব্রহ্মপুত্রের জল   বিপদসীমার ১৪ দশমিক ৪৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

কোন মন্তব্য নেই

Thankyou To Comment us

Blogger দ্বারা পরিচালিত.