এই গ্রামের প্রায় সকলেই বধির, ইশারায় প্রাণ পায় ভাষা
গ্রামের মাঝখানে ঝুপসি গাছের নীচে বাঁধানো সিমেন্টের বেদি। তাতে বসেই হাত-মুখের কসরত দেখাচ্ছেন তিনজন। ইশারার ভাষা। তাতেই জমে উঠছে আড্ডা। বেদিকে পিছনে ফেলে গ্রামের পথে আর একটু এগিয়ে দেখা গেল একই দৃশ্য। ইশারায় কথা বলতে বলতে হেসে গড়িয়ে পড়ছেন দুই তরুণী। বাজারে, দোকানে, স্কুলে একই ছবি। ইশারাই ভাব প্রকাশের মাধ্যম। সংকেতে প্রকাশ পায় মনের ভাষা।
এই গ্রামের পাহাড়, জঙ্গলে ঘেরা অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মন-প্রাণ জুড়িয়ে যায়! অথচ গ্রামের বেশির ভাগ বাসিন্দাই অত্যন্ত দারিদ্র। এই গ্রামে প্রায় তিন হাজার মানুষের বাস। তবে এই গ্রামের প্রায় সকলেই বধির, একে অপরের সঙ্গে কথা বলেন সাংকেতিক ভাষায়! ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপে উত্তরে অবস্থিত এই গ্রামের নাম বেংকালা।
বিশ্বে অনেক মানুষই একে বধিরদের গ্রাম বলেই চেনেন। চাষাবাদ আর পশুপালনই এই গ্রামের বাসিন্দাদের প্রধান জীবিকা। পর্যটন থেকেও আংশিক উপার্জন হয় গ্রামবাসিদের। গ্রামে আসা পর্যটকদের সঙ্গেও ইশারায় ‘কথাবার্তা’ বলেন বেংকালার বাসিন্দারা। বেংকালার বাসিন্দারা যে সাংকেতিক ভাষায় পরস্পরের সঙ্গে কথা বলেন সেটিকে ‘কাতা কোলক’ বলা হয়। এই গ্রামের সকলেই বধির নন।
তবে বেশির ভাগ বাসিন্দাই মূক-বধির হওয়ার সকলেই ‘কাতা কোলক’-এ পরস্পরের সঙ্গে কথা বলেন। এই ‘কাতা কোলক’ বেংকালা গ্রামের ঐতিহ্যেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। তবে ইদানীং, গ্রামের বাসিন্দারা আন্তর্জাতিক সাংকেতিক ভাষাও শিখছেন। দেশ-বিদেশ থেকে এই গ্রামে আসা পর্যটকদের মূল আকর্ষণ হল ‘জাঞ্জের কোলক’ বা বধিরদের নৃত্য।
বিজ্ঞানীদের মতে, এই গ্রামের বেশির ভাগ বাসিন্দাই এক বিরল জিনগত ত্রুটির শিকার। এই বিশেষ জিনগত ত্রুটিকে বিজ্ঞানীরা DFNB3 নামে চিহ্নিত করেছেন। এই জিনগত ত্রুটির কারণে মানুষের শ্রবনশক্তি অত্যন্ত ক্ষিণ হয় বা বধির হন। DFNB3-এর কারণেই মূলত বেংকালা গ্রামের বেশির ভাগ বাসিন্দাই বধির। মেয়র জানালেন, সরকারের তরফ থেকে গ্রামের উন্নয়নের জন্য অনেক বেশি বিনিয়োগ করা হচ্ছে। পর্যটক আকর্ষণের জন্য গড়ে উঠছে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।
সেখানে পাল্লা দিয়ে নাচ, গান, অভিনয় করছেন মূক-বধির গ্রামবাসীরা। কাটা-কোলোকেই লেখা হচ্ছে গান। উত্তর বালির ডিফ ডান্স হল ‘বালি কৃষ্ণা’তে প্রতি মাসেই নাচ, গানের আসর বসে। সেখানে পারফর্ম করেন বেংকালার মানুষজন। ‘‘আমাদের ১৬ জনের গ্রুপ রয়েছে। বয়স ১৬ বছর থেকে ৭২ বছরের মধ্যে, একসঙ্গে নাচ, গান করি,’’ বললেন থিয়েটার গ্রুপের প্রধান ওয়েন স্যান্ডি। হাতের মুদ্রায় স্যান্ডি দেখালেন, ‘‘আমরা সবাই এক। একতাই আমাদের শক্তি।’’ গানের পাশাপাশি ‘বালি কৃষ্ণা’ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের তদারকি করে পুটু গেডেসনোয়া। তাঁর কথায়, মূক-বধিরদের পারফরম্যান্স প্রাণ এনে দেয় মঞ্চে।
Post a Comment