ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ উপকুলীয় মোহনায়
ঢাকা প্রতিনিধি,বাংলাদেশ ; আশ্বিনের মূল প্রজনন মৌসুমকে সামনে রেখে দক্ষিণ উপকূলের সাগর মোহনায় স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি ডিমওয়ালা মা ইলিশের বিচরণ ও আহরণে আগামী বছর উৎপাদন নিয়ে দুঃশ্চিন্তা বাড়ছে মৎস্য বিজ্ঞানীদের মাঝে। আগামী ১৪ অক্টোবর থেকে আশ্বিনের বড় পূর্ণিমার অগে পরের ২২ দিন নিরাপদ প্রজননের লক্ষ্যে সারাদেশে ইলিশ আহরণ বন্ধ থাকবে।
গত বছরও ভাদ্রের মধ্যভাগের পরেই সাগর থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে মা ইলিশ উপকূলসহ দক্ষিণাঞ্চলের অভ্যন্তরীণ নদ-নদীতে উঠে আসায় ব্যাপক হারে জালে ধরা পড়ে। তবে এবার এখনো সাগরের ইলিশ অভ্যন্তরীণ নদ-নদীতে উঠে না এলেও উপকুলীয় মোহনায় ব্যাপক বিচরণে তা ধরা পড়ছে।
জেলে ও মৎসজীবীদের মতে, এবার দেশের উত্তর ও মধ্যঞ্চলে বন্যাসহ ভাদ্রের বড় অমাবশ্যায় ফুঁসে ওঠা সাগরের ভয়াল জোয়োরের প্লাবনে সমগ্র দক্ষিঞ্চল প্লাবিত হয়। সেসব পানি প্রবল বেগে সাগরে পতিত হবার কারণে ইলিশ এখনো দক্ষিণাঞ্চলের অভ্যন্তরীন নদ-নদীতে উঠে আসছে না।
তবে অসন্ন প্রজননকালের আগেই যদি উত্তর বঙ্গোপসাগর থেকে মা ইলিশ উপকূল হয়ে অভ্যন্তরীণ নদ-নদীতে উঠে আসতে শুরু করে, তবে তা আরো বড় বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে বলেও শঙ্কিত মৎস্য বিজ্ঞানীরা। মূল বর্ষা মৌসুমে কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি না হওয়ায় সাগরে পানির উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে মা ইলিশ আগাম উজানে ছুটে আসছে বলে একাধিক মৎস্য বিজ্ঞানী মনে করলেও এ লক্ষ্যে ব্যাপক গবেষণার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তারা। মৎস্য বিজ্ঞানীদের সুপারিশ মেনেই সরকার আশ্বিনের প্রথম উদিত চাঁদের পূর্ণিমার আগের ৪ দিন ও পরের ১৭ দিনসহ মোট ২২দিন ইলিশের মূল প্রজননকাল হিসেবে চিহ্নিত করে উপকূলের ৭ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকার মূল প্রজননস্থলে সবধরনের মাছের আহরন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে যাচ্ছে।
পাশাপাশি সারাদেশের নদ-নদীতে ইলিশ আহরন ছাড়াও এর পরিবহন ও বিপনন নিষিদ্ধ থাকবে। আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে ইলিশের একক অবদান এখন ১ শতাংশের বেশি। আর মৎস্য খাতে অবদান প্রায় ১২-১৩ শতাংশ। বিগত দুই দশকে ইলিশ নিয়ে নানামুখি পদক্ষেপের ফলে এর উৎপাদন ১.৯৮ লাখ টন থেকে ইতোমধ্যে সোয়া ৫ লাখ টন অতিক্রম করেছে। যার মধ্যে মূল প্রজননকালীন ২২ দিন সময়ে আহরণ ও বিপণন নিষিদ্ধ থাকার বিষয়টি ছাড়াও জাটকা আহরণ ও বিপণনে নিষেধাজ্ঞা অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করছে। ২০১৫ সালে আশ্বিনের পূর্ণিমার আগে পড়ে ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধকালীন ১৫ দিনের স্থলে ২০১৭ সালে ২২ দিনে উন্নীত করা হয়। ফলে এসময়ে ইলিশের নিষিক্ত ডিমের পরিমাণ ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৩৬৫ কেজি থেকে ৩৭ শতাংশ বেশি, অর্থাৎ ৬ লাখ ৭৬ হাজার ৩৯৫ কেজিতে উন্নীত হয়।
এমনকি ইলিশ পোনা জাটকার উৎপাদনও ২০১৫ সালে ৩৯ হাজার ২৬৮ কোটি থেকে ২০১৭ সালে ৪২ হাজার ২৭৪ কোটিতে উন্নীত হয়েছে বলে মৎস্য অধিদপ্তর জানিয়েছে।
মৎস্য বিজ্ঞানীদের দাবি, সারা বিশ্বে উৎপাদন হ্রাস পেলেও বাংলাদেশে গত দেড় দশকে ইলিশ উৎপাদন প্রায় তিনগুন বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে সারা বিশ্বে আহরিত ইলিশের প্রায় ৭৫ শতাংশ বাংলাদেশে, ১৫ শতাংশ ভারত ও মিয়ানমারে এবং থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, ইরান ও ইরাকে অবশিষ্ট ইলিশ উৎপাদিত হয়ে থাকে। গত বছর দেশে যে প্রায় সোয়া ৫ লাখ টন ইলিশ আহরিত হয়েছে, তার ৭০ ভাগই পাওয়া গেছে বরিশালে বিভাগের অভ্যন্তরীণ ও উপকূলীয় জলাশয় থেকে। বরিশাল বিভাগে ইতোমধ্যে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে ১৫০ শতাংশের বেশি।
জানা গেছে, সমুদ্র থেকে উপকূলের সাগর মোহনার ৪টি এলাকার প্রায় ৭ হাজার বর্গ কিলোমিটারে ডিম ছেড়ে আবার সাগরে ফিরে যায়। কিন্তু এবার ভাদ্রের মধ্যভাগ থেকে সাগর মোহনার নদ-নদীতে ইলিশের উপস্থিতি মৎস্য বিজ্ঞানী সহ অধিদপ্তরের দায়িত্বশীলদের কিছুটা ভাবনায় ফেলেছে। গত দিন দশেক ধরেই মেঘনা, তেতুলিয়া, বলেশ্বর ও আন্ধারমানিকসহ উপকুলের বিভিন্ন নদ-নদীর সাগর মোহনায় মা ইলিশের ব্যাপক বিচরণে জেলেদের জালে ধরাও পড়ছে।
তবে এবার করোনা সংকটে দক্ষিণাঞ্চল সহ সারা দেশেই চাহিদা কিছুটা কম থাকায় জেলেরা দাম না পেলেও গত সপ্তাহ থেকে ভারতে পুনরায় রফতানি শুরু হওয়ায় বাজারে এক কেজি সাইজের ইলিশের দাম বেড়েছে। বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা ও পিরোজপুরের ইলিশের মোকামগুলো কয়েকদিন কিছুটা স্বরব হলেও বেচকেনা অন্য বছরের তুলনায় কম বলে জানিয়েছেন একাধিক মৎসজীবী। পাশাপাশি আর দিন কুড়ি পরেই আশ্বিনের বড় পূর্ণিমার আগে পড়ের ২২ দিন ইলিশ আহরণ ও বিপণন বন্ধ হয়ে যাবে বিবেচনায় আড়তদাররা জেলেদের খুব একটা দাদন বা আগাম টাকাও ছাড় করছে না।
যার ফলে টাকার অভাবে বরফ, জ্বালানি ও দৈনন্দিন খরচ সংকুলন না হওয়ায় সাগর মোহনায় ছুটে ইলিশ আহরণে ততটা উৎসাহিত হচ্ছে না জেলেরা। এর পরেও প্রতিদিন দক্ষিণাঞ্চলের আড়তগুলোতে নুন্যতম ১ থেকে ৩০০ টন পর্যন্ত ইলিশ নিয়ে ট্রলার আসছে। যার বেশিরভাগই মা ইলিশ।
মৎস্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় উপ-পরিচালক, জানান মূল প্রজননকালের আগে অধিকহারে মা ইলিশ সাগর থেকে উঠে আসাকে ভাল লক্ষণ নয় বলে মন্তব্য করলেও এখানে তেমন কিছু করণীয় নেই বলেও জানিয়েছেন তিনি।

Post a Comment